ছোট্ট পাহাড়ি দেশ নেপাল। সবার প্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য। গতকালকের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা মনে করিয়ে দিচ্ছে, এখানে বারবার আঘাত হেনেছে ৮টি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
ছোট্ট পাহাড়ি দেশ নেপাল। হিমালয়ের অপরূপ সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সেখানে ছুটে যান পর্যটকেরা। কিন্তু নয়নাভিরাম এই দেশটিই বারবার ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ পাহাড়ি বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে জনপদ। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ, যাঁদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও আছেন।
সাম্প্রতিক এই হড়কা বান বা আকস্মিক বন্যা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, নেপালের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ কতটা বড় হুমকি। ভূমিকম্প থেকে বন্যা, ভূমিধস থেকে তুষারধস—বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে দেশটি।
নেপালের ভঙ্গুর হিমালয় ভূতাত্ত্বিক গঠন, খাড়া ভূপ্রকৃতি এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে দেশটির প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। এরই মধ্যে ইতিহাসে ভয়াবহতার ছাপ রেখে গেছে অন্তত আটটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
১. ১৫০৫ সালের লো মুস্তাং ভূমিকম্প
ঐতিহাসিকভাবে নথিবদ্ধ প্রাচীনতম শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি ১৫০৫ সালের লো মুস্তাং ভূমিকম্প। এর মাত্রা আনুমানিক ৮ থেকে ৮.৫ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

View this post on Instagram
২. ১৯৩৪ সালের বিহার–নেপাল ভূমিকম্প
৮ মাত্রার এই ভয়াবহ ভূমিকম্পে কাঠমান্ডু, ভক্তপুর ও পাতন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নেপালে প্রাণ হারান ৮ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ। এটি নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটি।
৩. ১৯৮৮ সালের উদয়পুর ভূমিকম্প
১৯৮৮ সালে পূর্ব নেপালে আঘাত হানে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প। এতে ৭২১ জনের মৃত্যু হয়। ভূমিকম্পটি দেশটির পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।

View this post on Instagram
৪. ২০১৫ সালের গোরখা ভূমিকম্প
২০১৫ সালের এপ্রিলে নেপালে আঘাত হানে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প। মে মাসে এর পরপরই ৭ দশমিক ৩ মাত্রার একটি শক্তিশালী পরাঘাত হয়।

দুই দফা ভূমিকম্পে প্রায় ৮ হাজার ৯০০ মানুষ নিহত হন। ভূমিকম্পে নেপালের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া এভারেস্টে ভয়াবহ তুষারধসের ঘটনাও ঘটে।
৫. ১৯৯৩ সালের মধ্য নেপালের বন্যা
১৯৯৩ সালে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়। এর ফলে ভয়াবহ ভূমিধস ও বন্যা দেখা দেয় মধ্য নেপালের বিভিন্ন এলাকায়। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারান। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কুলেখানি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রও।
৬. ২০০৮ সালের কোশি নদীর বন্যা
View this post on Instagram
২০০৮ সালে পূর্ব নেপালে কোশি নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর নদীটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে। এতে কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়।

৭. ২০২১ সালের মেলামচি বন্যা
২০২১ সালের বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক ও ভয়াবহ পানির স্রোতের সঙ্গে ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে মেলামচি শহরে। এতে শহরটির অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়।
৮. আগস্ট ২০২৬-এর আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস
নেপালে সর্বশেষ ভয়াবহ দুর্যোগটি আঘাত হানে ২৬ আগস্ট। প্রবল বর্ষণ ও তুষারধসের কারণে ভোতেকোশি নদীতে পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়। এর ফলে উত্তর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় ভয়াবহ হড়কা বান বা আকস্মিক বন্যা। একই সঙ্গে ঘটে ভূমিধস।
View this post on Instagram
বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৫৭ জন মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৪০৩ জন। তাঁদের অধিকাংশই বিদেশি পর্যটক বলে জানা গেছে।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। ফলে ভয়াবহ এই দুর্যোগে বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

View this post on Instagram
নেপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন পর্যটকদের টানে, তেমনি দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য তাকে করে তুলেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ। তাই হিমালয়ের এই সুন্দর দেশটির ইতিহাসে পর্যটনের পাশাপাশি বারবার ফিরে এসেছে দুর্যোগ, ধ্বংস আর শোকের গল্প।
সূত্র: উইকিপিডিয়া, নেপাল জার্নালস অনলাইন
ছবি: ইন্সটাগ্রাম








