বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

আজ শনিবার ঢাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিবিষয়ক এক পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ দাবি করেন তিনি। অনুষ্ঠানে তিনি জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইন দুটি পাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ওই পরামর্শ সভার আয়োজন করে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অধিকার। পরামর্শ সভার উদ্বোধনী ওই পর্বে সভাপতিত্ব করেন অধিকারের প্রেসিডেন্ট তাসনিম সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, সূচনা বক্তব্য দেন অধিকারের সমন্বয়ক কোরবান আলী।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা বলতে পারি, গত কয়েক মাসের সরকারে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে।’

মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন সংসদে না ওঠায় তা নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই বিল দুটি আরও যাচাই-বাছাইয়ের পর সংসদে তোলা হবে বলে তিনি জানান।

আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আশার কথা শোনাতে পারি, দুইটা (ওই দুটি) আইনের ফাইনাল আমরা তিন স্টেজে কনসালটেশন করেছি।…দুইটা আইন আমরা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে ক্যাবিনেট কমিটিতে পাঠিয়েছি। কমিটি এটা দেখে ক্যাবিনেটে উঠবে। আশা করছি, পরবর্তী ক্যাবিনেটে—এই দুইটা আইনে আমরা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়ে পার্লামেন্টে নিয়ে যাব।’

ধর্ষণের মামলা প্রত্যাহারের তালিকায় নয়

একজন সহকারী জজের বদলি, শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় শুধু সুপারিশ করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় চৌদ্দ শ নিম্ন আদালতের বিচারককে বদলি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে যাঁরা মোমবাতি জ্বেলে গণতন্ত্রকামী মানুষকে সাজা দিয়েছিলেন, তাঁরা কেউ কেউ প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছিলেন। যখন সেগুলো ঠিক করতে গেছি, সেখান থেকে ৭০ পারসেন্ট আমাদেরকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি সুপ্রিম কোর্ট থেকে। এ রকম একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ যাচ্ছে।’

‘যদি মনে করেন, সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, আমি বিনয়ের সাথে বলব, এটা সরকারের বিষয় না। সরকার যখন পার্টি ক্যাডারকে বসায় দেয় এবং এই জজ সাহেব যখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারেন, তখনই বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়ে।’

সুপ্রিম কোর্ট সঠিকভাবে সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় বিগত ১৬–১৭ বছর ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যদি নিয়োগ হয়, ভালো জজ যদি নিয়োগ হয়, ব্যক্তি যদি ভালো হয়, তাহলে কেবল একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও প্রত্যাশিত বিচার বিভাগ পাবেন। এ ধরনের বিচার বিভাগের স্বপ্ন শুধু কাগজে–কলমে রাখলে পাওয়া সম্ভব নয়।

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আরেকটা জায়গা খুব রশি টেনে ধরেছি। ধর্ষণের মামলা এলে সেই মামলা আমরা প্রত্যাহারের তালিকায় রাখব না। যত বড় রাজনৈতিক মামলাই হোক না কেন, সেটা আমাদের আরেকটা কমিটমেন্টের জায়গা।’

‘গুম মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ’

নির্যাতন প্রতিরোধ করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এ জন্য সরকারি সংস্থা, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সুশীল সমাজসহ সামগ্রিক একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন বলে মনে করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারপারসন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।

গুমকে মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ আখ্যায়িত করে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা প্রশাসনের সময় অনেক আইনপ্রয়োগকারী এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে অমানবিক ও দানবীয় করে তোলা হয়েছিল। সেই শাসনামলে তিন স্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে গুম সংঘটিত হয়েছিল। কৌশলগত স্তর, নির্বাহী স্তর ও কার্যকরী স্তর।

২০১৩ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন প্রণয়ন নিয়ে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তবে বাস্তবতা হলো বিভিন্ন কারণে এই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তি রোধ সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে।

সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়পাল নিয়োগ দিতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মইনুল ইসলাম চৌধুরী।

শাপলা চত্বর, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল সোমবার

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের অগ্রগতি বিষয়ে পরামর্শের সময় জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

আমিনুল ইসলাম ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ড নিয়ে অধিকারের প্রতিবেদন প্রকাশ এবং এরপর প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সম্পাদক আদিলুর রহমান খানের গ্রেপ্তার হওয়ার কথা স্মরণ করেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তদন্তের পর দেখলাম যে অধিকার যে রিপোর্ট দিয়েছিল—৬১ জন এবং ৬১ জনের রিপোর্টটি সঠিক। সেখানে আমরা ৫৮ জনের নাম-পরিচয় পেয়েছি। বাকি তিনজন এখনো পাইনি। হয়তো সেটা মামলা চলাকালীন পেয়ে যেতে পারি।’

এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, আগামী সোমবার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তিনি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করবেন। ওই দিন থেকে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হবে।

‘বিএনপি যেন আওয়ামী লীগ হয়ে না যায়’

আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি যাতে আবার আওয়ামী লীগ না হয়ে যায়, সে জন্য দু-তিনটে কাজ আমাদের করতে হবে। একটা কাজ করতে হবে—বিচার করতে হবে। যারা অপরাধী, তাদের বিচার করতে হবে।’

দ্বিতীয়ত, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জোর দিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, এ জন্য জনগণকে আওয়াজ তুলতে হবে। তাদের দাবির কথা বলতে হবে এবং সরকারের যুক্তিসংগত সমালোচনা করতে হবে।

তৃতীয়টি নিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো তারা যেন ভুলে না যায় যে ১৭ বছর এই সরকারের লোকজনও ভিকটিম ছিলেন। এটা যেন তারা ভুলে না যায়।