গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর অভিযোগ করেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে কিছু বিদেশি শক্তি আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামীর উত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যতের জন্য হুমকি।
রোববার (১৯ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণঅধিকার পরিষদ আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিশেষ অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
নুরুল হক নুর বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল, ছাত্র-জনতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। তবে আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে কিছু বিদেশি শক্তি এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের সময় বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তাকে নানান ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, আন্দোলনের শেষ কয়েক দিনে একটি বিদেশি মহল ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে। তার দাবি, কিছু শিক্ষার্থীকে দূতাবাসে রেখেও যোগাযোগ করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী / জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে বেশিদিন রাজনীতি করা যাবে না
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করা হয়েছে। ছাত্রদের ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে নুর বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অতীত অধ্যায়। তাদের কোনো বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নেই। দলটির যে কোনো তৎপরতা বন্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান সরকার সম্পর্কে নুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা এবং প্রবাসী কার্ড চালুর মতো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের কাজের অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করছেন।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রাখতে বিএনপির বিকল্প নেই। সরকারকে ব্যর্থ করার রাজনীতি নয়, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার রাজনীতি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা উল্লেখ করে নুরুল হক নুর দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে যে কোনো বিদেশি প্রভাব, ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে নুর বলেন, দেশের স্বার্থে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে জামায়াতের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। তার অভিযোগ, আজ তারা বাইরে সরকারবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে, কিন্তু ভেতরে ইতিবাচক আলোচনা করছে। বাইরে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করছে, যার ফলে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ধানাই পানাই মানবো না: জামায়াত আমির
তিনি দাবি করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের ব্যবহার করে জামায়াতপন্থিদের পদায়ন করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জ্বালানি খাত, বিসিএস ক্যাডারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যেন জামায়াতই দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি উল্লেখ করে নুর বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করা হয়েছে। অনেক আসনে বাস্তবতার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের কোনো মিল ছিল না।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু তরুণ রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার আগেই জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নুর বলেন, জামায়াতকে যারা সমর্থন করে, তারা জামায়াতেই আছে। কিন্তু নতুন করে যদি আরেকটি প্রক্সি রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
বিদেশি শক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় এবং পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। তার অভিযোগ, জামায়াতকে সামনে রেখে দেশে উগ্রবাদের উত্থানের একটি বর্ণনা তৈরি করে ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা হতে পারে।
সভায় তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
কেএইচ/কেএসআর








