চলতি মাসের শুরুতেই গ্রাহক পর্যায়ে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা। মিটার রিচার্জ করতে গিয়ে ২০০ ডিজিটের টোকেন নম্বর প্রবেশ করাতে হচ্ছে অনেককেই। দীর্ঘ এই নম্বর ইনপুট দিতে গিয়ে বারবার ভুল করছেন গ্রাহকরা।
মূলত বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর প্রথমবার রিচার্জে এ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিষয়টি গ্রাহকদের ভোগান্তিতে ফেললেও এখনই এ সমস্যার সমাধান নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, একটি টোকেন প্রবেশ করাতে সময় লাগছে কয়েক মিনিট। মাঝপথে কোনো সংখ্যা ভুল হলে পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে হচ্ছে। এতে বিশেষ করে বয়স্ক ও প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
আরও পড়ুন
প্রিপেইড মিটারে ২০০ ডিজিটের টোকেন নম্বর যেভাবে রিচার্জ করবেন
রাজধানীর মিরপুরের আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ২০০ ডিজিটের নম্বর দিতে গিয়ে আট-দশ বার ভুল করেছি। শেষে পরিবারের আরেকজনকে ডেকে নম্বর ইনপুট দিতে হয়েছে। এত বড় টোকেন ইনপুট দেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য খুবই কষ্টকর। এর সমাধান হলে ভালো হতো।
কথা হয় মুগদায় বসবাসকারী নাসরিন আক্তার নামের এক গৃহিণীর সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, একটা সংখ্যা ভুল হলেই আবার প্রথম থেকে ইনপুট শুরু করতে হয়। বিদ্যুতের দাম পরিবর্তনের জন্য এত বড় ভোগান্তি হবে ভাবিনি।
যেসব মিটার অফলাইনে রয়েছে, সেগুলোতে নতুন ট্যারিফ কার্যকর করতে গ্রাহকদের বিশেষ টোকেন নম্বর প্রবেশ করাতে হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে সেগুলো অনলাইনে সংযুক্ত হতে পারে না। এমন মিটারগুলোকেও অফলাইন বা নন-স্মার্ট মিটারের মতোই টোকেন নম্বর দিয়ে আপডেট করতে হচ্ছে।
লালবাগের হায়দার হোসেন বলেন, আমার স্মার্ট মিটার হলেও অনলাইনে আপডেট হয়নি। পরে জানতে পারি টোকেন দিতে হবে। এত বড় নম্বর দেওয়া সত্যিই বিরক্তিকর। বিদ্যুৎ বিল তো প্রতি মাসেই দিতে হয়। অথচ আমরা সুবিধা পাই না। সরকার কি পারে না এই সমস্যার সমাধান করতে!
প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব প্রিপেইড মিটার অনলাইনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, ট্যারিফ পরিবর্তনের পর সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ট্যারিফ অনুযায়ী আপডেট হয়ে যায়। ফলে এসব গ্রাহকের কোনো অতিরিক্ত টোকেন প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয় না।
আরও পড়ুন
প্রিপেইড মিটার রিচার্জে ২০০ ডিজিটের টোকেন, ভোগান্তিতে গ্রাহক
তবে যেসব মিটার অফলাইনে রয়েছে, সেগুলোতে নতুন ট্যারিফ কার্যকর করতে গ্রাহকদের বিশেষ টোকেন নম্বর প্রবেশ করাতে হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে সেগুলো অনলাইনে সংযুক্ত হতে পারে না। এমন মিটারগুলোকেও অফলাইন বা নন-স্মার্ট মিটারের মতোই টোকেন নম্বর দিয়ে আপডেট করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা চালুর পর থেকে যতবার বিদ্যুতের ট্যারিফ পরিবর্তন হয়েছে, প্রায় প্রতিবারই অফলাইন মিটার ব্যবহারকারীদের একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

২০০ ডিজিটের টোকেন মিটারে ইনপুট নিয়ে বিপাকে গ্রাহক/ ছবি- জাগো নিউজ
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যার সমাধান করতে হলে অফলাইন প্রিপেইড মিটারগুলো ধাপে ধাপে পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক স্মার্ট মিটার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি যেসব স্মার্ট মিটার কারিগরি ত্রুটির কারণে অনলাইনে সংযুক্ত হতে পারছে না, সেগুলোর জন্য আরও কার্যকর সফটওয়্যার ও আপডেটিং ব্যবস্থা বা নতুন প্রযুক্তিগত সমাধান উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্মার্ট মিটার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর করা গেলে ভবিষ্যতে ট্যারিফ পরিবর্তনের সময় গ্রাহকদের আর দীর্ঘ টোকেন নম্বর প্রবেশ করানোর ঝামেলায় পড়তে হবে না। এতে যেমন গ্রাহক ভোগান্তি কমবে, তেমনই বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও দক্ষ হবে। তবে সেটি সময় এবং ব্যয়সাপেক্ষ। সরকারের সিদ্ধান্ত এবং বাজেট ছাড়া এটি কার্যকর করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন
বিদ্যুতের দাম বাড়লো
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) সিস্টেম অটোমেশন আইসিটি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ খালিদ ওমর নিজামী জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৫ সাল থেকে এই সিস্টেম চলে আসছে। নন স্মার্ট মিটারের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ট্যারিফ পরিবর্তন হলে প্রথমবার রিচার্জে এই টোকেন দিতে হয়। এটা শুধুমাত্র আবাসিক গ্রাহকদের জন্য।
তিনি আরও বলেন, আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ছয়টা স্লাব আছে এবং একটা লাইফ লাইন আছে। সব মিলিয়ে সাতটা স্লাব। এই সাতটা স্লাবের জন্য ৭টা টোকেন, নতুন ট্যারিফ দেওয়া হলে মিটারের জন্য একটা ‘কি’ আছে, ওটা পরিবর্তন হয়। তার জন্য টোকেন। গ্রাহক যখন রিচার্জ করেন সেটার জন্য ২টা টোকেন। সবমিলিয়ে ১০টা টোকেন। প্রতিটা টোকেন ২০ ডিজিটের। ফলে এই ১০টা টোকেন মিলিয়ে তখন ২০০ ডিজিটের নম্বর হয়ে যায়।
অ্যানালগ মিটার সার্ভারের সঙ্গে কানেক্টেড না। মিটারে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে সেভাবেই বিল কাটবে, প্রোগ্রাম সেভাবে সাজানো আছে। ফলে যখন ট্যারিফ পরিবর্তন হয়, এই পরিবর্তনটা মিটারে লার্ন করাতে হবে। যাতে মিটার বুঝতে পারে কোন স্লাবের জন্য কত টাকা কাটবে।— বিদ্যুৎ বিভাগের সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. হুমায়ূন কবীর
এসব বিষয়ে বিদ্যুৎ,জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য ও প্রযুক্তি শাখার সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. হুমায়ূন কবীর জাগো নিউজকে বলেন, অ্যানালগ মিটার সার্ভারের সঙ্গে কানেক্টেড না। মিটারে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে সেভাবেই বিল কাটবে, প্রোগ্রাম সেভাবে সাজানো আছে। ফলে যখন ট্যারিফ পরিবর্তন হয়, এই পরিবর্তনটা মিটারে লার্ন করাতে হবে। যাতে মিটার বুঝতে পারে কোন স্লাবের জন্য কত টাকা কাটবে। যদি লার্ন করানো না হয় তাহলে আগের মতোই বিল কাটবে। এই লার্ন করানোর জন্য অতিরিক্ত এতগুলো টোকেন। এই টোকেন একবার দিলে পরে আর দেওয়া লাগবে না।
দুইশ ডিজিটের টোকেন প্রবেশ করানো বাস্তবতা বিবর্জিত কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক বিবেচনায় বাস্তবতা বিবর্জিত, আরেক বিবেচনায় না। কারণ, সবগুলো মিটার স্মার্ট না। প্রথমে আমরা যেসব মিটার দিয়েছিলাম সেগুলো নন স্মার্ট। এগুলোতে টোকেন লাগবে। আর যেগুলো স্মার্ট মিটার সেগুলোতে অটোম্যাটিক ট্যারিফ নিয়ে নেবে। নন স্মার্ট মিটারগুলো অনেক আগে লাগানো, তখন বাংলাদেশে স্মার্ট মিটার আসেনি।
আরও পড়ুন
‘ধনীদের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়া গরিবের অধিকার’
প্রযুক্তিগত দিক থেকে অন্য কোনো সমাধান আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ূন কবীর বলেন, এর বিকল্প কোনো সমাধান নেই। নন স্মার্ট মিটার যেহেতু অনলাইনে কানেক্ট করতে পারছি না, সেহেতু টোকেনের মাধ্যমেই মিটার লার্ন করাতে হবে। এটি মিটারের ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস, তাই টোকেন এভাবেই দিতে হবে। অন্য কোনো উপায় নেই।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন দীর্ঘদিন কাজ করছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, এভাবে চলতে পারে না, এর সমাধান করা উচিত। ট্যারিফ পরিবর্তন হলে ২০০ ডিজিটের টোকেন প্রবেশ করানোর বিষয়টা বাস্তবসম্মত নয়। অনেক বয়স্ক বা অল্প শিক্ষিত গ্রাহক আছেন তাদের ভোগান্তির মাত্রা বেশি। সংশ্লিষ্টদের বিষয়টা সমাধান করা উচিত।
২০০ ডিজিটের টোকেন আপডেটে বিদ্যুৎ বিভাগের বার্তা
বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ায় প্রিপেইড মিটারের টোকেন হালনাগাদ করতে গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গত ২৫ জুন বিদ্যুৎ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ায় গ্রাহকদের মিটারে ২০০ বা ততধিক ডিজিটের টোকেন আপডেট করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুসরণ করার অনুরোধ জানানো হয়।
আরও পড়ুন
ভোগান্তিতে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার গ্রাহকরা
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, টোকেন হালনাগাদ বা এ সংক্রান্ত কোনো ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হলে গ্রাহকেরা সংশ্লিষ্ট সংস্থার হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন। সেগুলো হলো- বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় সেবা ১৬৯৯৯, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ১৬২০০, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ১৬৮৯৯, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ১৬১১৬। এছাড়া ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) কল সেন্টার ১৬১২০, নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) ১৬৬০৩, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ১৬১১৭।
এনএস/কেএসআর








