ভারতের মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডিউটি-ফ্রি দোকানে অবৈধভাবে নিকোটিন পাউচ বিক্রির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। তদন্তে দেখা গেছে, শিল্পপতি গৌতম আদানির ব্যবসায়িক গোষ্ঠী পরিচালিত ডিউটি-ফ্রি দোকানগুলো সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এসব পণ্য বিক্রি করেছে, যা ভারতের আইনের লঙ্ঘন বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

তবে আদানি গ্রুপ সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আদালতে দাখিল করা নথিতে তারা দাবি করেছে, ওষুধ ও প্রসাধনী-সংক্রান্ত আইন ডিউটি-ফ্রি দোকান কিংবা নিকোটিন পাউচের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আইনজীবীদের মতে, এ মামলার রায় ভবিষ্যতে ভারতের বিমানবন্দরের ডিউটি-ফ্রি দোকানে নিকোটিনজাত পণ্য বিক্রির নিয়ম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে।

ভারতে আগে থেকেই ই-সিগারেট নিষিদ্ধ। তবে নির্দিষ্ট অনুমোদনের মাধ্যমে নিকোটিন প্যাচ ও চুইংগামের মতো কিছু নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট পণ্য বিক্রির অনুমতি রয়েছে। কিন্তু নিকোটিন পাউচ এখনো অনুমোদন পায়নি এবং এগুলোর বিক্রি অবৈধ।

ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত কারণে প্রতি বছর দেশে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি গবেষণায় নিকোটিন পাউচকে ‘নতুন এবং অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অ্যান্টি-নিকোটিন সংগঠন মাদারস অ্যাগেইনস্ট ভ্যাপিং-এর অভিযোগের পর গত মার্চে মুম্বাই বিমানবন্দরের ডিউটি-ফ্রি দোকানে অভিযান চালায় ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তদন্তে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক টার্মিনালের ডিপারচার জোনে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও আমদানি অনুমোদন ছাড়াই বিদেশ থেকে আনা নিকোটিন পাউচ বিক্রি করা হচ্ছিল।

এরপর ২ এপ্রিল বিমানবন্দরের কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে সহকারী ড্রাগ কন্ট্রোলার জানান, নিকোটিন পাউচও ওষুধের আওতাভুক্ত। তাই এগুলো বিক্রির জন্য বৈধ নিবন্ধন সনদ ও আমদানি লাইসেন্স বাধ্যতামূলক।

সরকারি নির্দেশে আদানি গ্রুপের নেতৃত্বাধীন মুম্বাই ট্রাভেল রিটেইল ও তাদের অংশীদার দুবাইভিত্তিক ফ্লেমিঙ্গো-কে নিকোটিন পাউচ বিক্রি বন্ধ করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের আইনে লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ বিক্রি করলে কমপক্ষে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম এক লাখ রুপি জরিমানা বা জব্দ করা পণ্যের মূল্যের তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

আদালতে আদানি গ্রুপ দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক ডিপারচার এলাকার ডিউটি-ফ্রি দোকানগুলো ভারতের শুল্কসীমার বাইরে পরিচালিত হয়। তাই সেগুলোর ওপর দেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রযোজ্য নয়।

তবে ওষুধশিল্পের সাবেক আইন উপদেষ্টা মুরালি নীলাকান্তন এই যুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, যদি ওই দোকানে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে, তাহলে কি ভারতীয় পুলিশ সেখানে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। একইভাবে সেখানে অস্ত্র বা গোলাবারুদ বিক্রিরও অনুমতি নেই।

গত ২৪ জুন মুম্বাই হাইকোর্ট আদানি গ্রুপের ডিউটি-ফ্রি দোকানে থাকা বর্তমান নিকোটিন পাউচের মজুতের বিরুদ্ধে আপাতত কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী শুনানি ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

বর্তমানে আদানি গ্রুপ ভারতের আটটি বিমানবন্দর পরিচালনা করছে এবং প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডিউটি-ফ্রি ব্যবসায় বড় বিনিয়োগ করছে। শুধু মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই তাদের ৩০টির বেশি ডিউটি-ফ্রি দোকান রয়েছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে আদানি গ্রুপ ফিলিপ মরিস-এর জিন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন স্বাদের নিকোটিন পাউচ এবং সুইডিশ ব্র্যান্ড হোয়াইট ফক্স আমদানি করেছে। ভারতের সাম্প্রতিক সরকারি গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয়েছে, এই দুটি ব্র্যান্ডের নিকোটিন পাউচ দেশটিতে অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে ফ্লেমিঙ্গো ডিউটি-ফ্রি হাইকোর্টে জানিয়েছে, তারা সমুদ্রবন্দরেও ডিউটি-ফ্রি দোকান পরিচালনা করে। তাই মুম্বাই বিমানবন্দরের মতো অন্য স্থানেও একই ধরনের আইনি পদক্ষেপের আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, নিকোটিন পাউচের জন্য আলাদা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হলে সরবরাহকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে পণ্য প্রত্যাহার করতে পারে, যা দেশের ডিউটি-ফ্রি শিল্পকে যাত্রীদের কাছে কম আকর্ষণীয় করে তুলবে।

সূত্র: রয়টার্স

এমএসএম