রাজধানী ঢাকা এক নীরব অথচ ভয়াবহ সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩ মিটার করে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। একটি মেগাসিটির পরিবেশগত ভারসাম্য এবং কোটি মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান রসদ যেখানে পানি, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া এক মহাবিপর্যয়ের পূর্বাভাস।

ঢাকার এই পানি সংকটের মূল কারণ স্পষ্ট। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা তার চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ গভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলন করে। প্রতিদিন এ শহরের ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার চাহিদার সিংহভাগ যদি ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে জোগান দেওয়া হয়, তাহলে সংকট যে তৈরি হবে, তা বলাই বাহুল্য। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় ভরাট এবং পুরো শহর কংক্রিটে ঢেকে ফেলার কারণে এমনিতেই বৃষ্টির পানি মাটির নিচে চুইয়ে পড়ার কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। ফলে প্রতিবছর উত্তোলিত পানি আর প্রাকৃতিকভাবে পূরণ হচ্ছে না।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এভাবে অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ার পরিবেশগত ও কাঠামোগত ঝুঁকি অপরিসীম। প্রথমত, এটি তীব্র পানির দুষ্প্রাপ্যতা তৈরি করছে। পানি যত গভীর থেকে তুলতে হচ্ছে, ওয়াসা ও সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ খরচ এবং পানি উত্তোলনের সামগ্রিক ব্যয় তত বাড়ছে। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে বড় শঙ্কাটি হলো ভূমিধস বা ভূ-তাত্ত্বিক বিপর্যয়। যদিও দেশে ঢাকার মাটির গঠন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো পর্যাপ্ত নয়, তবুও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমাদের শিউরে ওঠার মতো বার্তা দেয়। মেক্সিকো সিটি, জাকার্তা, ইতালির মিলান কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে মাটির ধারণক্ষমতা কমে শহর দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকাও যে এমন ঝুঁকিতে নেই, তা হলফ করে বলা যায় না, বিশেষ করে ঢাকার নরম ও দুর্বল মাটির এলাকাগুলোতে এ ঝুঁকি অনেক বেশি।

এই বিপর্যয় থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে আমাদের প্রথাগত চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আশার কথা, বর্তমান সরকার বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০৩০ সালের মধ্যে ভূ-উপরিস্থিত উৎসের পানির উৎপাদন ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। তবে শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এসব প্রকল্প যেন ঝুলে না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য শুধু নদীর পানি শোধনই শেষ কথা নয়। নদীর উৎস সচল রাখতে সবার আগে শিল্পবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলে নদী দূষণের প্রবণতা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি, শহরের ভেতরে থাকা অবশিষ্ট খাল, লেক ও জলাশয়গুলো উদ্ধার করে সেগুলোকে প্রাকৃতিক জলাধার হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। নতুন ভবনের নকশায় ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং কৃত্রিম উপায়ে মাটির নিচে পানি পুনর্ভরণের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। আমরা যদি এখনই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ না কমাই এবং ভূ-উপরিস্থিত উৎসের পানির ওপর নির্ভরতা না বাড়াই, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য এক নগরীতে পরিণত হতে পারে।