হয়তো সেই চায়ের দোকানের ছেলেটা একদিন আবার গোলটা দেখবে। প্রথমবার সে সেটিকে দেখেছিল নিজের পরাজয় হিসেবে। দ্বিতীয়বার সে দেখবে—সত্যিই কী অসাধারণ গোল ছিল!

গোলটা হয়েই গেল!
এ তো অবিশ্বাস্য। ডি বক্সের বাইরে থেকে এভাবেও গোল হয়! চায়ের দোকানটিতে বসে থাকা মুখগুলোতে প্রথমে স্তব্ধতা, তারপর অবিশ্বাস।
স্টেডিয়ামের গর্জন ভেসে এসে এই ছোট্ট দোকানের কাচের গ্লাসে, চায়ের ধোঁয়ায়, রাতজাগা কয়েকটি মুখে আটকে যায়। যে ছেলেটি গোল খাওয়া দলের সমর্থক, সে শুধু মাথা নিচু করে বসে থাকে।
তার পাশের মানুষটি খুব স্বাভাবিক গলায় বলে, ‘গোলটা কিন্তু দারুণ ছিল।’ ছেলেটি উত্তর দেয় না।
সেই মুহূর্তে ‘দারুণ’ শব্দটিও তার কাছে অপমান।

বিশ্বকাপের মরশুমে এই তো বাংলাদেশের চেনা দৃশ্য নয়। ছাদে ছাদে পতাকা—এক বাড়ির বারান্দায় আর্জেন্টিনা, পাশের গলিতে ব্রাজিল, আজকাল আবার কোনো দোকানের সামনে পর্তুগাল, কোথাও ফ্রান্সের পতাকাও দেখা যাচ্ছে। যে দেশগুলোর ভাষা আমরা জানি না, যে শহরে হয়তো কোনো দিন আমাদের যাওয়া হবে না, যাদের নির্বাচনে আমরা ভোট দিই না, যাদের জয়-পরাজয়ে আমাদের রাষ্ট্রের কিছু বদলায় না—সেই দেশগুলোর হার-জিতের রাতে আমাদের ঘুম বদলে যায়, মুখের ভাষা বদলে যায়, বন্ধুত্বের আবহাওয়া বদলে যায়।
কেউ মেসির জয়ে কাঁদে। কেউ রোনালদোর হারে সারা দিন চুপ থাকে। কেউ ম্যাচের আগেই পুরোনো মিম জমিয়ে রাখে। কেউ হারার পর ফোন বন্ধ করে দেয়। কেউ জেতার পর এমনভাবে কথা বলে, যেন গোলটা তার নিজের পায়ের শটে হয়েছে, যাকে আমরা আদর করে ফুটবল-পাগলামি বলি।

টিএসসিতে ব্রাজিলের খেলা বড় পর্দায় দেখতে আসা দর্শকেরা।

কিন্তু ঘটনা কি এতই সহজ
এক পৃথিবী সমান দূরত্বে থাকা এক স্টেডিয়ামের ঘটনা কীভাবে একজন মানুষের বুকের এত কাছে এসে পড়ে? একটি গোল কেন কারও কাছে শিল্প নয়, ব্যক্তিগত আঘাত হয়ে ওঠে? যে মানুষটা আর্জেন্টিনার নাগরিক নয়, পর্তুগালেরও নয়, সে কেন মনে করতে শুরু করে, মেসির পরাজয়ে তারও কিছু একটা হারিয়ে গেছে, রোনালদোর জয়ে তার বুকের ভেতরও একটুখানি সাহস উঠে দাঁড়িয়েছে?

মানুষের ইতিহাসে পতাকার আগে ছিল দল। দলের আগে ছিল একা হয়ে যাওয়ার ভয়। আসলে মানুষের ভেতরে সভ্যতার চেয়ে পুরোনো কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। আমি কার? আমার পাশে কে আছে? আমি কি এমন কোনো শক্তির সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি, যাকে সহজে ছোট করা যায় না?
মানুষ সব সময় সেরা হতে চায় না। সে শুধু চায়, এমন কোনো জায়গায় দাঁড়াতে, যেখানে তাকে খুব ছোট না লাগে।
যখন কেউ বলে, ‘আমার দল সেরা’, তখন সে সব সময় দম্ভ করছে না। অনেক সময় সে নিজের ভেতরের একটি পুরোনো ভয়কে শান্ত করছে। সব আসলে অহমের খেল!

বিশ্বকাপ সেই অহমের জন্য এক-দেড় মাসের এক বিশাল মঞ্চ বানিয়ে দেয়। এখানে পতাকা আছে, জাতীয় সংগীত আছে, নায়ক আছে, প্রতিনায়ক আছে, প্রতিপক্ষ আছে, অপমান আছে, প্রতিশোধ আছে, শেষ মুহূর্তে ফিরে আসার গল্প আছে। ৯০ মিনিটের মধ্যে এমন একটি পৃথিবী তৈরি হয়, যেখানে মানুষ খুব সহজ ভাষায় বলতে পারে—আমরা জিতেছি, দেখেছ?

টিএসসিতে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ভিড়।

এই ‘আমরা’ শব্দকে নিয়ে উপহাসের কিছু নেই। আমাদের নিজের জার্সি তো বিশ্বকাপের এই মহামঞ্চে নেই। তাই এখানে সমর্থন কখনো জন্মসূত্রের নয়; স্মৃতিসূত্রের। যে দলটি নিজের দেশের নয়, সেই দলই কখনো কখনো ঘরের হয়ে যায়।
কারও বাবা ব্রাজিল সমর্থন করতেন। তাঁর কাছে হয়তো পেলে কোনো ফুটবলার নন, শৈশবের আলো। কারও বড় ভাই রাত জেগে ম্যারাডোনার গল্প বলতে বলতে তাকে আর্জেন্টিনার জার্সি ধরিয়ে দিয়েছিল। কেউ মেসির পায়ের জাদুর পাশে বড় হয়েছে। কেউ রোনালদোর শৃঙ্খলা, ক্ষুধা আর নিজেকে তৈরি করার গল্পে নিজের জীবনের উত্তর খুঁজেছে।
তাই একজন মানুষ যখন আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসে, সে সব সময় শুধু আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসে না। সে হয়তো বাবার সঙ্গে দেখা প্রথম ম্যাচের রাতটাকে ভালোবাসে। সে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভাঙা টিভির সামনে বসে থাকা বন্ধুদের ভালোবাসে। সে হয়তো জীবনের এমন কোনো একটা সময়কে ভালোবাসে, যখন নিজের কিছুই ঠিকঠাক চলছিল না, কিন্তু দূরের একজন মানুষ বল পায়ে নিয়ে তার পৃথিবীটাকে একটু অন্য রকম করে দিয়েছিল।

মেসি ও রোনালদোর লড়াইও তাই কেবল গোলের হিসাব নয়। মেসির মধ্যে মানুষ দেখে প্রতিভা কখনো কখনো নীরব থেকেও চারপাশের বাতাস বদলে দিতে পারে। আবার শরীর, সময়, ব্যর্থতা আর সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে তৈরি করা মহাকাব্যের নাম রোনালদো।
তাই একজন ভক্ত শুধু প্রিয় খেলোয়াড়কেই বেছে নিচ্ছেন না, দুই রকম মহত্ত্বের মধ্যে নিজের জন্য সবচেয়ে উপযোগীটাকেই বেছে নিচ্ছেন। কারও কাছে মহান হওয়া মানে পৃথিবীর ওপার থেকে আসা মহাজাগতিক কোনো সুর, কারও কাছে আবার নিজের ভাগ্যকেই রোজ হারিয়ে দেওয়া। ঠিক এখানেই একজন মানুষ দূরের কোনো খেলোয়াড়, একেবারে অচেনা এক মানুষের কাছে নিজের দুঃসাহসের ইজারা নিয়ে নেয়।

ফুটবল আর বন্ধুত্ব—তোর টিমে, তোর পাশে
বিশ্বকাপ উপভোগের ভেন্যু হিসেবে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোচিত।

নিজের জীবনে যে সাহস তার ছিল না, যে উচ্চারণ সে করতে পারেনি, যে অসম্ভবকে নিজের বলে দাবি করার শক্তি সে পায়নি—ম্যাচের রাতে সে সেসব কিছুর পাশে দাঁড়ায়। কারণ, তার হয়ে কেউ একজন দাঁড়িয়ে গেছে।
মাঠে খেলছে একজন, অথচ বুক কাঁপছে অন্য কারও। সে গোল করছে, অথচ অন্য একজনের ভেতরে এমন এক দুঃসাহস জেগে উঠছে, যা সে নিজের নামে কখনো দাবি করতে পারেনি। সে হেরে যাচ্ছে, অথচ কারও মনে হচ্ছে, তার নিজের কোনো গোপন ঘর ফাঁকা হয়ে গেল।
তাই কেউ যখন বলে, ‘ও তো শুধু পেনাল্টি পায়’ কিংবা ‘ওর প্রতিভা বলে কিছু নেই’ কিংবা ‘ওর সব অর্জন সাজানো’—তখন হয়তো ভেবেছে, সে কেবল ঠাট্টা করছে। কিন্তু সেগুলো গিয়ে একজন মানুষের সেই বিশ্বাসের গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়ে যায়।
কারণ, সে শুধু খেলোয়াড়টিকে ভালোবাসেনি, সেই খেলোয়াড়ের মধ্যে সে নিজের এমন একটি সম্ভাবনা রেখে দিয়েছিল, যেটি হয়তো নিজের জীবনে সে এখনো ছুঁতে পারেনি। এই অনুভূতিকে উপহাস করার কিছু নেই।

মানুষ অন্যের জয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরেও একটু আলো খুঁজে নেয়। কোনো কবির ভাষায় নিজের কষ্টকে সুন্দর মনে হয়, কোনো গায়কের গানে নিজের নিঃসঙ্গতা সহনীয় হয়ে ওঠে, কোনো অভিনেতার চরিত্রে নিজের ভাঙাচোরা জীবনকে আরেকটু বড় মনে হয়। তেমনি কোনো ফুটবলারের মহত্ত্বও মানুষকে নিজের সীমার বাইরে তাকাতে শেখায়।

বড় পর্দায় আর্জেন্টিনার গোল দেখে রং ছিটিয়ে উদ্যাপনে মেতে ওঠেন সমর্থকেরা। স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্যের সামনে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর, ১৭ জুন

ধার করা দুঃসাহসেরও সৌন্দর্য আছে। বিপদ শুরু হয় তখন, যখন সেই দুঃসাহস নিজের জন্য পথ দেখানোর বদলে নিজের মর্যাদার একমাত্র উৎস হয়ে যায়।
‘মেসিকে ভালোবাসি’-এর বদলে মানুষ যখন বলে, ‘মেসিকে ছোট করলে তুমি আমাকে ছোট করছ’। ‘রোনালদো আমার প্রিয়’ না বলে কেউ যখন বলে, ‘রোনালদো হারলে আমার কারও সামনে মুখ দেখানোর উপায় নেই’। সেই মুহূর্তে ফুটবল আর ফুটবল থাকে না। সেটি হয়ে যায় আত্মরক্ষার যুদ্ধ। আর আত্মরক্ষার যুদ্ধে সৌন্দর্যের জন্য খুব কম জায়গা থাকে।
তখন প্রতিপক্ষের দুর্দান্ত গোলও সুন্দর লাগে না। তার অসাধারণ পাস, তার সাহস, তার ফিরে আসা—সবকিছু ব্যক্তিগত আঘাতের মতো মনে হয়। মনে হয়, এই সৌন্দর্য আমাকে ছোট করার জন্যই জন্ম নিয়েছে।
সেই জায়গায় এসে একজন সমর্থক আর শুধু অনুরাগী থাকে না। সে হয়ে ওঠে প্রহরী। সে তার দলের নয়, নিজের আহত মর্যাদার পাহারা দেয়। আর প্রহরীরা সৌন্দর্য দেখে না, তারা দেখে হুমকি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই হুমকিকে আরও বড় করে দেয়। সেখানে জেতার আনন্দের চেয়ে প্রতিপক্ষের লজ্জাকে প্রদর্শন করা দ্রুত ছড়ায়। কেউ কাঁদছে, সেটি মিম। কেউ চুপ করে আছে, সেটি দুর্বলতা। কেউ নিজের প্রিয় খেলোয়াড়ের হার মেনে নিয়েছে, সেটি বিশ্বাসঘাতকতা। যেন ভালো সমর্থক হওয়ার একমাত্র প্রমাণ হলো, তুমি প্রতিপক্ষকে কতটা ছোট করতে পারো।

কিন্তু ফুটবল কি আমাদের এত ছোট হতে বলেছিল
খেলার দুনিয়ায় কি আসলেই একা মহৎ হওয়া যায়? প্রতিপক্ষই একজনকে বড় করে তোলে, একজনের আলো অন্যজনের ছায়া নয়; তার উচ্চতাকে আরও স্পষ্ট করে। নিজের নায়ককে বড় প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যজনকে মাটিতে নামিয়ে ফেলতে চাইলে আমরা আসলে মহত্ত্বেরই অপমান করি।
নিজের দলের জন্য কাঁদলে প্রতিপক্ষের অসাধারণ খেলাকে সম্মান করা যাবে না—এমন তো কোনো কথা নেই। বরং এ এমন এক মানুষের শক্তি, যার আত্মসম্মান কেবল স্কোরবোর্ডের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। যে মানুষটি জানে, তার প্রিয় খেলোয়াড় হারতে পারে, তার দল বিদায় নিতে পারে, তার ধার করা দুঃসাহস এক রাতের জন্য নিভে যেতে পারে, তবু তার নিজের মাথা নিচু হয়ে যায় না।

দেয়ালে আঁকা হয়েছে পছন্দের খেলোয়াড়ের মুখচ্ছবি। সেখানে প্রিয় দলের জার্সি পরে চলছে ফুটবলের কসরত। কে এম দাস লেন, টিকাটুলী, ঢাকা, ৩ জুন

মানুষ চায়, বিশালত্বের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে যেন ছোট না লাগে। মহাজাগতিক নক্ষত্রের আলোয় যেন তাকে অন্তত চাঁদের মতন লাগে। এই চাওয়ার মধ্যে লজ্জা নেই। এর মধ্যে মানুষের একাকিত্ব আছে, স্বীকৃতির ক্ষুধা আছে, হারিয়ে না যাওয়ার গভীর চেষ্টা আছে।
কিন্তু চাঁদের মতন লাগার জন্য আকাশের অন্য সব আলো নিভিয়ে দিতে হয় না।

হয়তো সেই চায়ের দোকানের ছেলেটা একদিন আবার গোলটা দেখবে। প্রথমবার সে সেটিকে দেখেছিল নিজের পরাজয় হিসেবে। দ্বিতীয়বার সে দেখবে—সত্যিই কী অসাধারণ গোল ছিল!
তার বুকের ভেতর তখনো কষ্ট থাকবে, সে তখনো পরাজিতের দলেই থাকবে। সে হয়তো এখনো মেসিকেই ভালোবাসবে, কিংবা রোনালদোকেই নিজের নায়ক ভাববে। সেদিন সে বলতে শিখবে, ‘হেরেছি সত্য, কিন্তু খেলাটা কী দারুণ ছিল!’
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ফুটবল জিতে যাবে।

সাবেক ক্রীড়া সাংবাদিক, প্রথম আলো