২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—তিনটি দেশ মিলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর। ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ, ১৬টি শহর এবং আনুমানিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাজস্ব—শুধু এই সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায়, আধুনিক বিশ্বকাপ আর নিছক খেলার মাঠের বিষয় নয়। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে তাকালে প্রশ্ন জাগে, ফুটবল কি সত্যিই বিশ্বকে একত্র করে, নাকি বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি শিকড় গেড়ে বসে?

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাই ১৯৯০ সালে যে ‘সফট পাওয়ার’ তত্ত্বটি প্রণয়ন করেন, তার মূল কথা হলো, একটি রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে নয়, সাংস্কৃতিক আকর্ষণ ও মূল্যবোধের প্রচারের মাধ্যমেও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নাই বলেছিলেন, সফট পাওয়ারের অর্থ হলো ‘অন্যরা তোমার মতো যা চাইবে, তাই পাওয়ার ক্ষমতা’—জোর করে নয়, টেনে নিয়ে আসার মাধ্যমে তারা আদায় করে নেয়। ফুটবল বিশ্বকাপ এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে গত কয়েক দশকে।

২০১৮ সালে রাশিয়া এবং ২০২২ সালে কাতার—দুটি বিশ্বকাপই এমন দেশে আয়োজিত হয়েছে, যাদের মানবাধিকার রেকর্ড খুব একটা ভালো ছিল না। কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনে প্রায় ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে, যা রাশিয়ার ব্যয়ের প্রায় ১৫ গুণ। অর্থনীতিবিদদের কাছে এই বিনিয়োগের লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলানো কঠিন, কিন্তু ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকেরা জানেন, এই অর্থ কোনো পণ্যের বিনিময়ে নয়, এটি ‘ইমেজ’ কেনার বিনিয়োগ। শিক্ষাবিদ পল ব্র্যানাগান ও রিচার্ড গিউলিয়ানত্তি এই প্রক্রিয়াকে বলেছেন ‘সফট পাওয়ার অ্যান্ড সফট ডিসেমপাওয়ারমেন্ট’—একদিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ, অন্যদিকে নিজেদের দুর্বলতাগুলো আড়াল করার সুচতুর কৌশল।

‘স্পোর্টসওয়াশিং’ শব্দটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। সমাজবিজ্ঞানী আর্জিরো ম্যানলি, আয়ানিস কনস্ট্যান্টোপুলোস ও জর্জিওস আন্তোনোপুলোস তাঁদের গবেষণায় স্পোর্টসওয়াশিংকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে—‘এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র ক্রীড়া আয়োজনকে তাদের জনপরিচিতি উন্নত করার কাজে ব্যবহার করে।’ বিশেষত কাতারের উদাহরণ এই তত্ত্বকে সামনে এনেছে। একটি ক্ষুদ্র উপসাগরীয় রাষ্ট্র, যেখানে মানবাধিকার সংস্থাগুলো লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের শোষণের তথ্য নথিভুক্ত করেছে, সেই রাষ্ট্র ফুটবলের মঞ্চকে ব্যবহার করে নিজেকে ‘মডার্ন আরব নেশন’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ এ ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ই-ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ‘ইনভলান্টারি স্পোর্টসওয়াশিং’ বা অনিচ্ছাকৃত স্পোর্টসওয়াশিংয়ের ধারণাটি তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি হলো, ফিফা ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের ভাবমূর্তি পরিষ্কার করতে নামেনি, কিন্তু প্রতিটি ঘটনা বাণিজ্যিকভাবে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তের সমষ্টি দ্বারা একটি ফলাফল তৈরি করেছে, যা কার্যত রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্বকাপেই, মার্কিন ইমিগ্রেশন প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) প্রতিনিধিদের মাঠে উপস্থিত থাকার খবরে বিশ্বের নানা দেশের সমর্থকেরা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।

বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করলেও তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এই মুহূর্তে জটিল। ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য শুল্কনীতি ও অভিবাসন বিধিমালা কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যেই ইউএসএমসিএ (নর্থ আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির নতুন সংস্করণ) পুনঃ আলোচনা চলছে টুর্নামেন্টের সময়কালেই। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তিনটি দেশ এক মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও তাদের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্বকাপের উৎসবের আবহকে জটিল করে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এই বিশ্বকাপে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। ইরানের সম্ভাব্য প্রত্যাহারের প্রশ্ন উঠেছিল, যদিও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখানে সিদ্ধান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। ইরান শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করলেও তাদেরকে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে। এক দেশে অবস্থান করে অন্য দেশে খেলতে হয়েছে। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষকেরা যথার্থই বলেছেন, বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জন মানে বিরাট আর্থিক পুরস্কার, স্পনসরশিপের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা—এসব ছেড়ে কোনো দেশের বয়কটের পথে হাঁটা আসলে শুধু রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বিপুল অর্থনৈতিক ত্যাগও বটে। অর্থনীতির টান তাই ভূ-রাজনীতির চাপকে অনেক সময় স্তিমিত করে দেয়।

ফিফার কাঠামোটি বোঝা দরকার। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে অলাভজনক সংস্থা, কিন্তু কার্যত একটি বহুজাতিক করপোরেশনের মতো কাজ করে। এর বার্ষিক আয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য আকাশচুম্বী এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা সমসাময়িক বড় করপোরেশনগুলোর নির্বাহীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অর্থনৈতিক সমাজবিদ্যার পরিভাষায় এটিকে বলা যায় ‘ট্রান্সন্যাশনাল ক্যাপিটালিস্ট ক্লাস’ বা বহুজাতিক পুঁজিপতি শ্রেণির একটি সাংস্কৃতিক প্রকাশ। এখানে মুনাফার লক্ষ্য এবং আদর্শের ভাষা পাশাপাশি বিদ্যমান!

২০১৫ সালে ফিফার কেলেঙ্কারির ঘটনা এই কাঠামোকে সবার সামনে উন্মোচন করেছিল। মার্কিন বিচার বিভাগের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে দশকের পর দশক ধরে বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার প্রদানে ঘুষের বিনিময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কেলেঙ্কারির পরেও ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক আলেকজান্ডার দুকালস্কি মন্তব্য করেছেন, ‘ফিফা “সাদা খামের সংস্কৃতি” থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হয়েছে, যা আরও গভীর এক সতর্কতার বার্তা দেয়।’

জোসেফ নাইয়ের সফট পাওয়ার তত্ত্বের পাশাপাশি ইতালীয় মার্ক্সবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বা হেজেমনি তত্ত্বটিও ফুটবলের রাজনীতি বুঝতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গ্রামসি বলেছিলেন, শাসকশ্রেণি কেবল আইন ও শক্তির মাধ্যমে নয়, সংস্কৃতি ও প্রতীকের মাধ্যমে সম্মতি তৈরি করে শাসন বজায় রাখে। ফুটবল বিশেষত বিশ্বকাপ—এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যখন একসঙ্গে কোনো ফুটবল খেলা দেখেন, তখন তাঁরা শুধু গোলের উল্লাস ভাগ করেন না, আয়োজক দেশের সাংস্কৃতিক বার্তাও নিজের অজান্তে গ্রহণ করেন।

ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইতিহাসের প্রথম ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান করেছেন; একটি পুরস্কার, এর আগে যার কখনো অস্তিত্ব ছিল না। শিক্ষাবিদেরা এটিকে দেখছেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের লক্ষণ হিসেবে। অন্যদিকে ফিফার ক্রমবর্ধমান সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, সৌদি আরবের ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পাওয়া এবং সৌদি আরামকোর মতো কোম্পানির প্রধান স্পনসর হওয়া—সবকিছুই প্রশ্ন তোলে যে ফুটবলের জগতে ক্ষমতা এবং মূল্যবোধের মধ্যে কে বড়?

ট্রাম্প প্রশাসন এই আসরকে একটি কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মার্কিন নেতৃত্বের শক্তি দেখানোর একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘দ্য কনভার্সেশন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের জন্য বিশ্বকাপ হলো একটি ‘সফট পাওয়ার কু’-এর সুযোগ। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ, অভিবাসন নীতি—এই সুযোগকে ‘নিজের জালে বল ঢোকানো’র আশঙ্কায় পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে ভালোবাসেন প্রচণ্ড আবেগ দিয়ে। যদিও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত খেলতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে খেলবে, তারও কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এই ভালোবাসার মধ্যে একটি নীরব প্রশ্ন থাকে, আমরা কি কেবল দর্শক, নাকি এই বৈশ্বিক খেলায় আমাদেরও কোনো ভূমিকা আছে? নাইয়ের ‘সফট পাওয়ার’ তত্ত্ব কেবল বড় দেশগুলোর জন্য নয়, ছোট দেশগুলোও যদি শক্তিশালী ক্রীড়া কূটনীতি গড়তে পারে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের ভূমিকা তৈরি করতে পারে, তাহলে এই মঞ্চ থেকেও কিছু পাওয়া সম্ভব।

আসলে বিশ্বকাপের মাঠে যে খেলা হয়, তা শুধু ২২ জন খেলোয়াড়ের নয়, এটি রাষ্ট্রের মর্যাদার লড়াই, পুঁজির প্রবাহের খেলা, সংস্কৃতির টানাপোড়েন এবং ভূ-রাজনীতির নিরন্তর প্রতিযোগিতা। নাই বলেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীতে সফট পাওয়ার আরও জটিল হয়েছে—এটি কাজে লাগানো যায়,

ভুল বোঝানো যায়, এমনকি বিপরীতমুখীও করা যায়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই জটিলতারই জীবন্ত প্রকাশ। এখানে বল গড়ায়, গোল হয়, দর্শক উল্লাস করে; আর তার আড়ালে চলে রাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশ, ক্ষমতার দর-কষাকষি এবং বিশ্বব্যবস্থার নতুন রূপরেখা নির্মাণ।

ফিফার মূলমন্ত্র হলো ‘ফুটবল ইউনাইটস দ্য ওয়ার্ল্ড’, ফুটবল বিশ্বকে একত্র করে। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, একত্র করার প্রতিশ্রুতি এবং বিভাজনের বাস্তবতা মাঝে মাঝে একই মাঠে দাঁড়িয়ে থাকে। পার্থক্যটা বোঝা যায় কেবল তখন, যখন আমরা গোলের উৎসবের পেছনে লুকানো রাজনীতির ভূগোল পড়তে শিখি।

এম এম মুসা, উন্নয়নকর্মী ও গবেষক