বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ প্রায় শেষ পর্যায়ে। গ্রুপভিত্তিক খেলাগুলো ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং আজ ১১ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বাকি থাকবে ১৪ ও ১৫ জুলাই সেমিফাইনাল, ১৮ জুলাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলা। বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৯ জুলাই। খেলা যত শেষদিকে যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ফুটবলপ্রেমিক জাতিগুলোর মাঝে উত্তেজনা তত বাড়ছে। এবারের স্বাগতিক তিনটি দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে ১১টি ভেন্যু যুক্তরাষ্ট্রে, ৩টি মেক্সিকোতে ও ২টি কানাডায়। আমেরিকানরা ফুটবলপ্রেমিক জাতি না হলেও তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফুটবলের একক স্বাগতিক দেশ ছিল।
আমেরিকানদের জনপ্রিয় খেলার তালিকায় ফুটবলের স্থান চতুর্থ। তাদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় জনপ্রিয় খেলাগুলো হচ্ছে-আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল ও বেসবল। আর ‘ফুটবল’ খেলা বলতে তারা বোঝে ‘সকার বল’। ‘দ্য হ্যারিস পোল’-এর জরিপ অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে আমেরিকানদের ফুটবলপ্রীতি বাড়লেও ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ চলাকালে এটি তাদের তৃতীয় জনপ্রিয় খেলার স্থানে উঠে এসেছে। উইকিপিডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ইউএস সকার ফেডারেশনে তালিকাভুক্ত ফুটবল খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। নামি ফুটবল টিমের সংখ্যা ১৯৯৬ সালের ১০ থেকে এখন ২৭-এ উন্নীত হয়েছে এবং এ টিমগুলোর খেলার সময় ২০ হাজারের বেশি দর্শকের স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকার রেকর্ড রয়েছে। ন্যাশনাল ওম্যান সকার লিগের ফুটবল টিম সংখ্যা ১৬ এবং ২০২৬ সালের মার্চে ডেনভারে নারীদের এক ফুটবল টুর্নামেন্টে ৬৩ হাজার দর্শক স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিল।
এবারের বিশ্বকাপের অধিকাংশ খেলা যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে বিশ্বের বহু দেশের ফুটবলপ্রেমী, এমনকি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কর্মকর্তাদের মার্কিন ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অসংখ্য ভিসা আবেদনকারীর ভিসা যে কেবল বাতিল করার ঘটনা ঘটেছে তা নয়, ভিসা পাওয়ার পরও অনেককে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। কানাডার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৩৯টি দেশের ওপর পূর্ণ বা আংশিক ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তা বহাল থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ফুটবলপ্রেমিকরা বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো অরাজনৈতিক উপলক্ষ্য উপভোগ করার উদ্দেশ্যে বি-১/বি-২ ক্যাটগারির ভিসা, যা সাধারণভাবে ট্যুরিস্ট ভিসা হিসাবে পরিচিত, সেই ভিসার জন্য আবেদন করারও সুযোগ পাননি। পূর্ণ ও আংশিক ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোর অধিকাংশই জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতির কারণে প্রশ্ন উঠেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো নির্দোষ একটি বিষয়কেও বিষিয়ে তুলেছে’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের একদেশদর্শী নীতির কারণে বিশ্বকাপ ফুটবলের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারের বিশ্বকাপ খেলা সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সবচেয়ে কলঙ্কিত টুর্নামেন্ট হিসাবে চিহ্নিত থাকবে। বিবিসি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দেশের মধ্যে ১১টির ক্ষেত্রে আমেরিকান ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ৪০ শতাংশের বেশি।
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ ঘিরে কী ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য আমন্ত্রণ লাভকারী প্রথম সোমালি রেফারি ওমর আরতানের বৈধ আমেরিকান ভিসা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছার পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। কারণ হিসাবে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী যোগসূত্রের অভিযোগ দেখানো হয়েছে। ওমর আরতান দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন এবং এ অপমানজনক ঘটনার প্রতিবাদে সোমালিয়ায় তাকে বীরের মর্যাদায় সংবর্ধনা জানানো হয়। ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি জিবরিল আল-রাজুবকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ইরানের ফুটবল প্রতিনিধিদলের পনেরো সদস্যকে ভিসা প্রদান করা হয়নি। ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার অনুমতি না দেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত তাদের খেলাগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করতে হয়েছে। ইরানি ফুটবল দলকে ১৫ জুন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এবং ২১ জুন বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে খেলতে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে এবং ২৬ জুন মিসরের বিরুদ্ধে খেলতে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটল আসতে হয়েছে মেক্সিকো থেকে।
এখানেই শেষ নয়, ইরাকি স্ট্রাইকার আইমেন হোসেনকে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে সাত ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। অভিবাসন কর্মকর্তারা তার মোবাইল ফোন নিয়ে তল্লাশি চালায়। ইরাকি ফুটবল দলের ফটোগ্রাফার তালাল সালাহকে বিমানবন্দরে দশ ঘণ্টারও বেশি সময় আটক রাখার পর তাকে বহিষ্কার করা হয়। ব্রাজিলের ক্রীড়া সাংবাদিক কারিনে আলভেস নিউজার্সির এক বিমানবন্দরে পৌঁছলে তার ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পরনের জামা-কাপড় খুলে তাকে তল্লাশি করা হয়। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার অজুহাত দিয়ে সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। আইভরি কোস্ট সমর্থক গোষ্ঠীর সভাপতি অভিযোগ করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার আইভরি কোস্টসহ কিছু দেশের সমর্থকদের তাদের ভূখণ্ডে দেখতে চায় না।’
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি মরক্কোর ডজনখানেক সমর্থককে। তাদের অনেকে প্রায় ৫০০ ডলার মূল্যে খেলার টিকিট কিনেছিলেন। অনেকে তিনটি খেলার প্যাকেজ কিনেছিলেন ১,৫০০ ডলার মূল্যে। এছাড়া তারা ভিসা ফি দিয়েছেন ১৮০ ডলার। এর সঙ্গে আছে বিমান ভাড়া এবং অগ্রিম পরিশোধ করা হোটেল ভাড়া। ফিফা যদিও ২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবলকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ’ বলে দাবি করেছিল; কিন্তু তা উপহাসে পরিণত হয়েছে বৈষম্যমূলক আচরণের মাধ্যমে আফ্রিকান ও মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মানুষকে বিশ্বকাপ উপভোগ করা থেকে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে আমেরিকান সরকারের ভিসানীতির কঠোর প্রয়োগই সমালোচনার একমাত্র বিষয় নয়, দৃশ্যমান দুর্নীতিমূলক উপায়ে ফুটবলপ্রেমীদের আর্থিকভাবে শোষণ করার কারণে ফিফাও একইভাবে সমালোচিত। ফিফার আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত বিমান ও ট্রেনভাড়া তথা নির্লজ্জ লোভ বিশ্বকাপ ফুটবলকে কলুষিত করেছে। স্টেডিয়ামের সবচেয়ে বাজে আসন, যেখান থেকে দর্শকের পক্ষে ভালো করে খেলা দেখাও সম্ভব নয়, সেই টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬০ ডলার। কিন্তু এ মূল্যে দুই শতাংশেরও কম টিকিট বিক্রয় হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই টিকিটগুলোই বিক্রি করা হয়েছে গড়ে ১,৬০০ ডলারের বেশি মূল্যে। ফাইনাল খেলা এখনো বাকি। ফাইনালের সবচেয়ে কম মূল্যের টিকিটের দাম ২,৬০০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং ফাইনালের সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির টিকিটের দাম নির্ধারিত ছিল ৬,৭৩০ ডলার। কিন্তু চাহিদাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির কারণে টিকিটের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২,৯৭০ ডলারে, অর্থাৎ ৪১৭ শতাংশ বেশি। স্বাগতিক শহরগুলোতে বিমানের ফ্লাইট পরিচালনাকারী আমেরিকান এয়ারলাইন্সগুলো ভাড়া বৃদ্ধি করেছে ৪২ শতাংশ। ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে নিউইয়র্ক সিটির অদূরে নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। নিউইয়র্ক থেকে গণপরিবহণে সেখানে যেতে ভাড়ার পরিমাণ ১৩ ডলার; কিন্তু ফাইনাল খেলার দিন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যেতে গণপরিবহণে ভাড়া গুনতে হবে ৯৮ ডলার।
টিকিটের অযৌক্তিক চড়ামূল্যের কারণে ক্রীড়ামোদিদের আপত্তিতে সাড়া দিয়ে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির সরকারি প্রসিকিউটররা ফিফার বিরুদ্ধে আইনগত তদন্ত শুরু করেছেন। ২০২২-২০২৬ সময়ে ফিফার মোট আয় ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৩ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী চার বছরের ৭.৫৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের নেতৃত্বে থাকা প্রধান স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার নেতৃত্বাধীন দেশে জবাবদিহিমুক্ত সংস্থা ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফানতিনো, যিনি নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের চেয়ে বরং একটি রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে ভাবেন। ফিফা পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ফেয়ার-স্কোয়ার’ সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলন ‘রিবুট ফিফা’। তারা বলেছে, ‘বিশ্ব ফুটবল পরিচালনার জন্য ফিফা উপযুক্ত নয় এবং সংস্থাটিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে; যাতে এ আন্তর্জাতিক সংস্থাটি ফুটবল খেলাকে দুর্নীতি থেকে বের করে আনতে পারে এবং বৃহৎ করপোরেট ব্যবসায়ী ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের তদারকি করার পরিবর্তে ফুটবল খেলোয়াড়, ফুটবলপ্রেমীদের স্বার্থে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি পরিচালনা করে।’
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক








