কেপ ভার্দে এই বিশ্বকাপের বিস্ময়। প্রায় আড়ালে থাকা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র এই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসে নকআউটে চলে গেল। শেষ ৩২-এ তাদের সামনে লিওনেল মেসির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দের রূপকথা আফ্রিকান ফুটবলের মহা সাফল্যেরই একটি অংশ। ২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকান ফুটবলের নবজাগরণ ও আত্মপ্রকাশ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
৪৮ দলের বিশ্বকাপে এবার রেকর্ড ১০টি আফ্রিকান দেশ খেলার সুযোগ পায়। গ্রুপপর্ব শেষ হওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে যায় আফ্রিকার উত্থান। আফ্রিকা মহাদেশের ১০ দলের মধ্যে নয়টিই জায়গা করে নিয়েছে শেষ ৩২-এ। স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল কিংবা ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিরাও আফ্রিকান প্রতিপক্ষের বিপক্ষে হোঁচট খেয়েছে। মরক্কো থেকে কেপ ভার্দে-প্রতিটি দলই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নতুন পরিচয় তুলে ধরেছে। কেপ ভার্দের রূপকথার যাত্রা ফিফার জন্যও বড় স্বস্তির কারণ। ৩২ থেকে ৪৮ দলে বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। অভিযোগ ছিল, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য দলসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু কেপ ভার্দের মতো দলের সাফল্য সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তৈরি করেছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ কেপ ভার্দে। পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার এই দ্বীপরাষ্ট্র বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচেই শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিয়ে চমক দেখায়। কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনিয়া স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স করে রাতারাতি ইন্টারনেট সেনসেশনে পরিণত হন। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে দুর্দান্ত নৈপুণ্যের পর তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৭০ লাখে। উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গেও ড্র করে কেপ ভার্দে। ফলে এ দুই দল তাদের পেছনে পড়ে বিদায় নেয় টুর্নামেন্ট থেকে। আলজেরিয়ার তারকা রিয়াদ মাহরেজ মনে করেন, আফ্রিকার এই সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা নয়। তার ভাষায়, ‘বিশ্বকাপের মতো আসরে ১০ দলের মধ্যে নয়টি নকআউটে উঠেছে। এটি আফ্রিকান ফুটবলের মান ও উন্নতির প্রমাণ।’
একই সুর ডিআর কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের কণ্ঠেও। গত ১৫ বছরে আফ্রিকার ফুটবল কাঠামো, কোচিং ব্যবস্থা এবং খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়ায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, সেটিকেই তিনি এই সাফল্যের ভিত্তি হিসাবে দেখছেন। তার বিশ্বাস, আফ্রিকার কোনো দেশের বিশ্বকাপ জেতা এখন সময়ের ব্যাপার। এই আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় প্রতীক মরক্কো। ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দল হিসাবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া দলটি এবারও নিজেদের সামর্থ্যরে জানান দিয়েছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচে দীর্ঘ সময় আধিপত্য দেখিয়েছে অ্যাটলাস লায়ন্সরা। শেষ ৩২-এ নেদারল্যান্ডসের মতো কঠিন প্রতিপক্ষ পেলেও আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর দলটি। কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলছেন, ‘আমাদের এই লক্ষ্যকে (বিশ্বকাপ জয়ের) বিশ্বাস করতে হবে। মরক্কো এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।’
আফ্রিকার সাফল্য দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে নতুন শক্তিরাও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে ছবির উলটোদিকও আছে। এশিয়ার নয় দলের মধ্যে মাত্র জাপান ও অস্ট্রেলিয়া নকআউট পর্বে উঠেছে। জর্ডান ও উজবেকিস্তান নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ শেষ করেছে কোনো পয়েন্ট ছাড়াই। উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কুরাসাও, হাইতি ও পানামাও বিদায় নিয়েছে কোনো ম্যাচ না জিতে। তবু বিশ্বকাপের এই অধ্যায়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল রং আফ্রিকার। একসময় যাদের সাফল্য ছিল বিস্ময়, তারা এখন নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বী। আফ্রিকানদের উত্থান আরও বাস্তব রূপ নিয়েছে আর্জেন্টিনার মতো ফুটবল পরাশক্তির বিপক্ষে নকআউট পর্বে খেলবে কেপ ভার্দে।








