বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দল আর্জেন্টিনা। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি ২০২৬ বিশ্বকাপেও ফাইনালে উঠেছে। তবে ইতিহাসের এক সময়ে বিশ্ব ফুটবলের এই পরাশক্তিরই বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায়ও আছে, যেখানে তারা টানা তিনটি আসরে অংশই নেয়নি। সেই অনুপস্থিতির পেছনে ছিল পেশাদার লিগের সূচনা, ফিফার সঙ্গে মতবিরোধ, আয়োজক নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষ এবং দেশের ফুটবল প্রশাসনের সংকট।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আর্জেন্টিনা ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল জাতি। ইউরোপের বাইরে সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ লিগগুলোর একটি ছিল তাদের। ১৯২৮ অলিম্পিক ফুটবলের ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েছিল তারা। এরপর ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপেও ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে শিরোপা জিততে পারেনি, আবারও হারতে হয় উরুগুয়ের কাছেই।

এরপর শুরু হয় বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনার দূরে সরে যাওয়ার গল্প। ১৯৩১ সালে আর্জেন্টিনায় পেশাদার ফুটবল লিগ চালু হয়। কিন্তু ১৯৩৪ বিশ্বকাপের আগে ক্লাবগুলো তাদের খেলোয়াড় ছাড়তে রাজি হয়নি। সে সময় ফিফার বর্তমানের মতো শক্তিশালী কাঠামো বা বাধ্যতামূলক নিয়ম ছিল না। জাতীয় দলগুলোও আর্থিক সহায়তা পেত না। ফলে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) পেশাদার ফুটবলারদের না পাঠিয়ে মূলত অপেশাদার খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি দল ইতালিতে পাঠায়। সেই দল প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়।

১৯৩৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার প্রত্যাশা ছিল বিশ্বকাপটি হবে আর্জেন্টিনায়। কারণ প্রথম আসর হয়েছিল উরুগুয়েতে, দ্বিতীয়টি ইতালিতে। অলিখিত আবর্তন নীতি অনুযায়ী তৃতীয় আসর দক্ষিণ আমেরিকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফিফা আয়োজক হিসেবে বেছে নেয় ফ্রান্সকে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ বয়কট করে। একই কারণে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েও অংশ নেয়নি।

এই সময়েই আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটে। ইতালীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় লুইস মন্টি, রাইমুন্ডো ওরসি, আতিলিও দেমারিয়া ও এনরিকে গুইতার মতো কয়েকজন তারকা ইতালির হয়ে খেলতে শুরু করেন। তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী এটি বৈধ ছিল এবং ১৯৩৪ বিশ্বকাপজয়ী ইতালি দলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ হয়নি। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ফিরে এলেও আর্জেন্টিনা সেখানে যায়নি। এর পেছনে ছিল ব্রাজিল ফুটবল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রশাসনিক বিরোধ এবং তৎকালীন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। সেই বিরোধের জের কাটেনি ১৯৫৪ সালেও। ফলে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে অনুপস্থিত থাকে আর্জেন্টিনা।

এদিকে ১৯৪৮ সালে আর্জেন্টিনার ফুটবলে বড় ধরনের খেলোয়াড় ধর্মঘট শুরু হয়। ক্লাব ও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দ্বন্দ্বে দেশের ফুটবল কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এই সুযোগে কলম্বিয়ার বিখ্যাত ‘এল দোরাদো’ যুগের সূচনা হয়। বেশি বেতন ও সুযোগ-সুবিধার লোভে বহু আর্জেন্টাইন ফুটবলার কলম্বিয়ায় পাড়ি জমান। সেই সময়েই ইউরোপের নজরে আসেন কিংবদন্তি আলফ্রেডো দি স্টেফানো। তবে বিশ্বকাপ থেকে দূরে থাকায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ আর কখনো পাননি তিনি।

দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৫৮ সালে বিশ্বকাপে ফিরে আসে আর্জেন্টিনা। তবে এরই মধ্যে দেশের প্রথম সোনালি প্রজন্ম ভেঙে গেছে, বদলে গেছে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রও। বিশ্বকাপে নিজেদের হারানো অবস্থান ফিরে পেতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও বহু বছর।

এসকেডি/এমএমআর