দক্ষিণ ফ্রান্সের অন্যতম ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম ভেলোদ্রোম যেন সবকিছুকেই স্বাগত জানায়। ১৯৩৭ সালে, তৃতীয় বিশ্বকাপ (এবং ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ) শুরুর ৩৫৬ দিন আগে উদ্বোধনের পর থেকেই এটি নিজেকে শুধু অলিম্পিক মার্সেইয়ের ঘরের মাঠ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং বিশ্বমঞ্চে বহুমুখী এক ভেন্যু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এখানে পারফর্ম করেছেন কিংবদন্তি টেনর লুসিয়ানো পাভারোত্তি ও রক ব্যান্ড এসি/ডিসি। তিনটি ভিন্ন দশকে এই স্টেডিয়ামে কনসার্ট করেছে দ্য রোলিং স্টোনস। এটি ছিল অলিম্পিকের ভেন্যু, আয়োজন করেছে দুটি রাগবি বিশ্বকাপ, দুটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ।
স্টেডিয়ামটি খেলাধুলাকে যেমন গ্রহণ করেছে, তেমনি গ্রহণ করেছে সঙ্গীতকেও। আবার স্টেডিয়ামটি বহুমুখী ব্যবহারের চূড়ান্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ১৯৯৮ সালের ২৩ জুনের সন্ধ্যায়। সেদিন এটি পরিণত হয়েছিল একটি বিয়ের মঞ্চে।

১৯৯৮ বিশ্বকাপ চলাকালীন এই স্টেডিয়ামের মাঠেই বিয়ে করেছিলেন ব্রাজিলের রোজাঞ্জেলা ডি সৌজা ও নরওয়ের ওইভিন্দ একেলান্দ। বিশ্বকাপ চলার সময় বিশ্বকাপের কোনো স্টেডিয়ামের মাঠে বিয়ে করার এমন ঘটনা এর আগে যেমন ঘটেনি, তেমনই এরপরও আর কখনো ঘটেনি।

বিশ্বকাপ শুরুর তৃতীয় দিন গ্রুপ ‘এ’-এর ম্যাচে ব্রাজিল-নরওয়ে লড়াই ছিল তাদের আট বছরের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আদর্শ উপলক্ষ। ইপানেমা সৈকতের মোরো দইস ইর্মাওস পাহাড়ের পটভূমিতে এক নরওয়েজীয় পর্যটক হিসেবে একেলান্দের সঙ্গে পরিচয় হয় রিও ডি জেনেইরোর বাসিন্দা রোজাঞ্জেলার। সেই পরিচয় থেকেই প্রেম, আর পরে রোজাঞ্জেলার স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় বসবাসের সিদ্ধান্ত।

কিক-অফের এক ঘণ্টা আগে প্রায় ৫৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতেই সম্পন্ন হয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র বিয়ের অনুষ্ঠান।
বর-কনের আবেদনের পর ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টি ফিফার কাছে পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলিয়ান সভাপতি হোয়াও হাভেলাঞ্জের নেতৃত্বাধীন ফিফা অনুমতি দেয়।

ফিফার তৎকালীন যোগাযোগ পরিচালক কিথ কুপার বলেছিলেন, ‘অনেক চিন্তাভাবনার পর ফিফা মনে করেছে, আমরা যখন বলি ফুটবল ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের বন্ধনে মানুষকে একত্রিত করে, তখন সেটি বাস্তবেও দেখানোর এটি একটি দারুণ উপায়।'

তবে তিনি একটি শর্তও জুড়ে দেন। এটি একেবারেই ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা এবং একই ধরনের অসংখ্য আবেদন এড়াতে সংবাদমাধ্যমকে আগে থেকে কিছু না জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল হবু দম্পতিকে।

তবে বিয়ের অনুষ্ঠানটি ছিল অনেকটাই প্রচলিত রীতির। নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে আসা এক যাজক বিয়ে পড়ান। উপস্থিত ছিলেন দুই পরিবারের সদস্য ও অতিথিরা। এমনকি চার বছর বয়সী তাদের মেয়ে ক্রিস্টিনও মাঠে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। কনের সাদা গাউন ও ঘোমটা, আর বরের ঐতিহ্যবাহী মর্নিং স্যুট—সবই ছিল অনুষ্ঠানের অংশ।

এরপর রাতের আসল আকর্ষণ ছিল ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচ। বর্তমান নরওয়ে কোচ স্তালে সোলবাক্কেনও তখন খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে ছিলেন। শেষ দিকে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নরওয়ে ২-১ গোলে হারায় তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে।

যদিও দুই দলই নকআউট পর্বে ওঠে। নরওয়ে শেষ ষোলোতে ইতালির কাছে বিদায় নেয়। অন্যদিকে ব্রাজিল পৌঁছে যায় ফাইনালে। সেই ফাইনালই হয়ে ওঠে নবদম্পতির মধুচন্দ্রিমার একটি অংশ। স্টাড দ্য ফ্রান্সের গ্যালারিতে বসে তারা দেখেছিলেন স্বাগতিক ফ্রান্সের শিরোপা জয়।

পরে তাদের ঘরে জন্ম নেয় দ্বিতীয় সন্তান কেভিন। ওইভিন্দ একেলান্দ নরওয়ের স্ট্যাভেঞ্জারে একজন সফল ব্যবসায়ী ও নাইটলাইফ উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। অন্যদিকে রোজাঞ্জেলা ২০০৮ সালে শহরটির একমাত্র ব্রাজিলিয়ান রেস্তোরাঁ সাম্বা অ্যান্ড গ্রিল চালু করেন।

আজ তারা আর একসঙ্গে নেই; বিচ্ছেদের পর দুজনেই নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তবে এখনও একই শহরে বসবাস করেন। সেই শহরেই, আর দুই মহাদেশের অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে, ভেলোদ্রোমে ২৬ বছর আগে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচ আজও বিশেষ হয়ে আছে—কারণ সেটিই ছিল এমন এক বিয়ের উপলক্ষ, যেখানে বিশ্বের আর কোনো বিশ্বকাপে আগে বা পরে কেউ বলতে পারেনি সেই ঐতিহাসিক দুটি শব্দ-‘আমি রাজি।'

আরএএইচইউএল/এসকেডি/এএসএম