বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব চলছে। প্রতিটি ম্যাচই ফুটবলারদের অনেক পরিশ্রম হয়। শক্তি কমে যায় তাঁদের, ভারী হয়ে আসে পা। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। পাশাপাশি বিশ্বকাপের আবেগ ও মানসিক চাপে মস্তিষ্ক প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটা ম্যাচ খেলার পর শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক দিন সময় লেগে যায় খেলোয়াড়দের। আর মানসিক ক্লান্তি দূর করার ব্যাপারটা তো আরও জটিল।

২০২৬ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের প্রতিটি রাউন্ড পেরোনোর অর্থ আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি ভ্রমণ, পরিবেশের সঙ্গে নতুন করে মানিয়ে নেওয়া এবং আরও বেশি মানসিক চাপ। ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে সতেজ হওয়াটা আরও কঠিন। কিন্তু এত কিছুর পরও বিশ্বকাপ খেলোয়াড়দের উপহার দেয় দারুণ কিছু। সাবেক ফরাসি ডিফেন্ডার বাকারি সানিয়া যেমনটা বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলে খেলতে যাওয়া ছিল একটা আশীর্বাদের মতো। ফুটবলের তীর্থস্থান, দেশের সৌন্দর্য, সেখানকার মানুষ ও দারুণ পরিবেশ। দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতাটা ফুটবলারদের জন্য সত্যিই এক আশীর্বাদ।’

টুর্নামেন্টের এই প্রচণ্ড চাপের মধ্যে নিজেদের সতেজ ধরে রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী দলের পারফরম্যান্স স্টাফ এবং যুক্তরাষ্ট্র দলের সাবেক হেড অব পারফরম্যান্স ডার্সি নরম্যান বলেন, ‘টুর্নামেন্টের গভীরে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো শারীরিক, মানসিক, কৌশলগত এবং টেকনিক্যাল সতেজতা ধরে রাখা। সতেজতাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যে দল এটা যত ভালোভাবে ধরে রাখতে পারবে, তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা ততটাই বেড়ে যাবে।

বেতন পান না কোচ, নিজেরাই খাবার কিনে খাচ্ছেন সেনেগাল দলের খেলোয়াড়েরা

২০২৬ বিশ্বকাপে দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্রমণ। উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় পৌঁছাতে খেলোয়াড়দের সমুদ্রসহ একাধিক টাইম জোন পাড়ি দিতে হয়েছে। কখনো মায়ামি বা মন্তেরেইয়ের প্রচণ্ড গরম, আবার কখনো মেক্সিকো সিটি বা গুয়াদালাহারার বেশি উচ্চতার পরিবেশের সঙ্গে তাঁদের মানিয়ে নিতে হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচের পরই তাঁদের আবার ছুটতে হচ্ছে নতুন গন্তব্যে।

লম্বা সময় ধরে বিমানে একাধিক টাইম জোন পাড়ি দিলে খেলোয়াড়দের জেট ল্যাগ হয়। শরীরের ভেতরের ঘড়িটা তখন স্থানীয় সময়ের বদলে নিজের দেশের সময়ের সঙ্গেই আটকে থাকে। ফলে ঘুম, সতর্কতা এবং পারফরম্যান্সে ব্যাঘাত ঘটে। ফরাসি ফরোয়ার্ড রায়ান চেরকি উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর পর ফরাসি দলের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা এক ভিডিওতে বলেছিলেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছে যেন রাতটা এক দশক ধরে চলেছে! সাধারণত পূর্ব দিকে গেলে প্রতি টাইম জোনের জন্য এক দিন এবং পশ্চিম দিকে গেলে অর্ধেক দিন সময় লাগে শরীরকে মানিয়ে নিতে।

জেট ল্যাগের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভ্রমণক্লান্তি। ম্যাচ, শহর এবং ভিন্ন পরিবেশের মধ্যে বারবার যাতায়াতের কারণে শরীরে জমতে থাকে ক্লান্তি। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্লান্তির প্রভাব মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বরং ঘুম, শরীরের ব্যথা এবং মানসিক চাপের ওপর বেশি পড়ে। ভ্রমণের কারণে রিকভারি, প্রস্তুতি এবং দৈনন্দিন রুটিনের অনেকখানি সময় নষ্ট হয়ে যায়।

ক্রোয়েশিয়ার হয়ে দুটি বিশ্বকাপ খেলা এবং ২০১৮ সালের ফাইনালে ওঠা ইভান রাকিতিচ ভ্রমণের এই কষ্টটা খুব ভালোভাবেই জানেন। তিনি বলেন, ভ্রমণ হলো সবচেয়ে জঘন্য, যেখানে পাঁচ-সাত ঘণ্টা সময় এমনিতেই নষ্ট হয়। শুধু প্লেনের জার্নিই নয়, প্লেন ধরার আগে বাসে করে দেড় ঘণ্টা বিমানবন্দরে যাওয়ার কষ্টটাও আছে। স্পেনে ১৩ বছর কাটানো রাকিতিচ মজা করে বলেন, তিনি একটু স্প্যানিশ হয়ে গেছেন। তাই দুপুরে একটু ঘুমানো তাঁর খুব পছন্দ। কিন্তু ভ্রমণের কারণে সেই ঘুমটুকুও হয় না এবং টানা ছয় সপ্তাহ ধরে প্রস্তুতির রুটিন বদলাতে হয়। এতে খেলোয়াড়ের ওপর বড় প্রভাব পড়ে।

তবে সবাই যে ভ্রমণকে অপছন্দ করেন, তা কিন্তু নয়। ফরাসি তারকা বাকারি সানিয়া আবার জার্নিটাকে বেশ মজার বলেই মনে করেন। তাঁর মতে, প্লেনে নিজের মতো জায়গা পাওয়া যায়, ঘুমানো যায় এবং দলের সবার মধ্যে দারুণ একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। আসলে কে কীভাবে ভ্রমণটা নেবে, তা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কিছু খেলোয়াড় ভ্রমণের মাঝে শক্তি খুঁজে পান, কিন্তু বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই চান এটাকে কোনোমতে পার করতে।

তবে ইংল্যান্ডের আছে অদ্ভুত কৌশল। নকআউট পর্ব শুরু হলেই দলগুলোকে এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটতে হয়। গ্রুপ পর্বে যে বেজক্যাম্প তাদের একটা স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছিল, সেটা ছেড়ে যেতে হয়। তবে মাত্র কয়েকটি দল বাড়তি খরচ ও লজিস্টিক ঝামেলার কথা জেনেও বারবার তাদের চেনা বেজক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে কোন দল সবচেয়ে বেশি ফাউল করেছে, সবচেয়ে ভদ্র কারা

ইংল্যান্ড দল ঠিক এমনই একটা কাজ করেছে। তারা যদি গ্রুপসেরা হয়, তবে নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচের পর তারা নিজেদের বেজক্যাম্প কানসাস সিটিতে ফিরে যাবে। বারবার এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার বদলে বেজক্যাম্পে ফেরার কারণে তাদের প্রায় ৪৩ শতাংশ পথ বেশি ভ্রমণ করতে হবে। এত কষ্ট কেন? কারণ, এতে তারা প্রতি রাতে নিজেদের চেনা বিছানায় এবং চেনা টাইম জোনেই ঘুমাতে পারবে।

খেলোয়াড়দের ঘুম ও রিকভারি নিয়ে কাজ করা বিশ্বের অন্যতম সেরা গবেষক প্রফেসর ড. শেনিয়া হ্যালসন বলেন, ‘বারবার টাইম জোন বদলানোর চেয়ে একই টাইম জোনে থাকাটা শরীরের জন্য বেশি ভালো, এমনকি সেটা যদি এক বা দুই ঘণ্টার পার্থক্যও হয়।’ ইভান রাকিতিচও এই চেনা পরিবেশের টানটা বোঝেন। তিনি বলেন, লিগের ম্যাচ শেষে যেমন খেলোয়াড়রা নিজের বাড়িতে ফেরে, তেমনি ক্যাম্পকেও নিজের বাড়ির মতোই মনে হয়। তবে ডার্সি নরম্যান মনে করেন, ভ্রমণ নিয়ে মানসিকতাটাও খুব জরুরি। তাঁর মতে, ভ্রমণকে যদি মনে মনে বড় কোনো সমস্যা ভাবা হয়, তবে সেটা বড় সমস্যাই হয়ে দাঁড়াবে; আর স্বাভাবিকভাবে নিলে কোনো সমস্যাই হবে না।

দর্শক অভিবাদনের জবাবে ইংল্যান্ড দল

তাপমাত্রা, উচ্চতা ও ভ্রমণের ধকল তো আছেই, কিন্তু শুধু এগুলোর কারণেই যে কিছু দল ছিটকে পড়ে আর কিছু দল সামনে এগিয়ে যায়, তা কিন্তু নয়। শারীরিক সতেজতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটা গল্পের একটা অংশ মাত্র। রাকিতিচের মতে, সাত-আটটা ম্যাচ খেলার কারণে খেলোয়াড়রা যতটা না ক্লান্ত হন, তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত হন অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা, প্রস্তুতি, অ্যানালাইসিস এবং নিজের ও সতীর্থদের খেয়াল রাখার মানসিক চাপের কারণে।

ম্যাচের পর পেশির এনার্জি কমে যায়, পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং তীব্র লড়াইয়ের কারণে পেশিতে তৈরি হওয়া আণুবীক্ষণিক ক্ষত সারাতে শরীরকে কাজ করতে হয়। পা ভারী হয়ে আসা বা পেশির ব্যথা কয়েক দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। পেশির এনার্জি বা পানিশূন্যতা হয়তো দ্রুত ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু পেশির ব্যথা ও ক্ষত সারাতে বেশি সময় লাগে। তাই অনেক সময় শরীরের সব সিস্টেম পুরোপুরি রিকভার করার আগেই খেলোয়াড়দের মাঠে নামতে হয়।

অন্যদিকে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয় একটানা মনোযোগ ধরে রাখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রবল চাপের কারণে। এটা মাপা খুব কঠিন হলেও খেলোয়াড়দের মনোযোগ এবং পারফরম্যান্সে এর বিশাল প্রভাব থাকে।

খেলোয়াড়দের এই ক্লান্তি দূর করার জন্য দলের ভেতরে আরেকটা দল কাজ করে—ডাক্তার, ফিজিও এবং পারফরম্যান্স স্টাফ। তাঁরা শুধু রুটিন বানান না বরং এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে খেলোয়াড়রা শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে সতেজ থাকতে পারেন। রাকিতিচ মনে করেন, মাঠের খেলোয়াড়দের চেয়ে মাঠের বাইরের এই দলটার গুরুত্ব অনেক সময় বেশি হয়।

সঠিক পুষ্টি, পানি পান এবং ভালো ঘুম হলো রিকভারির মূল ভিত্তি। ইউরোপের অন্যতম সেরা রেস্ট অ্যান্ড রিকভারি স্পেশালিস্ট আন্না ওয়েস্ট বলেন, ‘ঘুম জিনিসটা শুধু রাতে তৈরি হয় না, এটা দিনের বেলায় কাজের ওপর নির্ভর করে। ঘুমানোর আগে সারা দিন একজন খেলোয়াড় কীভাবে রুটিন মেনে চলেছেন, সেটাই রাতের ভালো ঘুম নিশ্চিত করে। জার্মানির হেড অব পারফরম্যান্স নিকলাস ডিট্রিচ বলেন, তাঁরা প্রথমেই বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করেন এবং তারপর সঠিক পরিবেশ তৈরির জন্য সমাধান খোঁজেন।

আর্লিং হলান্ড কেন নরওয়ের হয়ে খেলেন

ভাবতে পারো, ম্যাচের মধ্যে রিকভারির জন্য বেশি সময় পেলে হয়তো খেলোয়াড়দের জন্যই ভালো! কিন্তু ব্যাপারটা সব সময় তেমন নয়। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী জার্মান তারকা পার মার্টেস্যাকার বলেন, চার দিনের গ্যাপ থাকলে খেলোয়াড়দের ফোকাস ঠিক থাকে। কিন্তু গ্যাপ বেশি হলে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা করার সুযোগ তৈরি হয়। তখন আত্মবিশ্বাসের জায়গায় সন্দেহ উঁকি দিতে পারে। রাকিতিচও প্রতি তিন-চার দিন পরপর ম্যাচ খেলতেই বেশি পছন্দ করেন।

তাদের কাছে ম্যাচের মাঝের গ্যাপের চেয়ে গ্যাপের সময়কার পরিবেশটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার ক্যাম্পের পরিবেশ এতটাই দারুণ ছিল যে রাকিতিচ দলের ডাক্তারকে বলেছিলেন, তিনি বাড়ি ফিরে গেলে ডাক্তারকে খুব মিস করবেন। ক্রোয়েশিয়া দলের দীর্ঘদিনের ডাক্তার জোরান বাহতিয়ারেভিচ বলেন, ‘একজন খুশি এবং সন্তুষ্ট খেলোয়াড়ই মাঠে নিজের ১২০ শতাংশ উজাড় করে দেন।’

২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগের রাতে রাকিতিচ অসুস্থ ছিলেন এবং ডাক্তার সারা রাত তাঁর পাশে জেগে ছিলেন। ম্যাচের দিন দুপুর পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত ছিলেন না যে তিনি খেলতে পারবেন কি না। কিন্তু দুজনের মধ্যকার গভীর আস্থার কারণে তিনি মাঠে নামেন এবং সেমিফাইনালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন।

সব সময় তো আর প্ল্যান মতো সবকিছু হয় না। নিকলাস ডিট্রিচ বলেন, ‘বিশ্বকাপে অনেক ভ্রমণ, টাইম জোন ও আলাদা আবহাওয়ার কারণে সবকিছু নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়; এটা খেলোয়াড়দেরও বুঝতে হবে।’

বিশ্বকাপে সতেজতা মানে শুধু পায়ের শক্তি নয়; বরং মস্তিষ্কের শক্তি, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পুরো দলের এক হয়ে লড়াই করার মানসিকতা। ২০১৮ সালের ফাইনালের আগে রাকিতিচ যেমনটা বলেছিলেন, ‘আমি এখন একটা মেশিন। কারণ আমি এখানে এসেছি একটা স্বপ্নের জন্য।’

বিশ্বকাপ হয়তো অনেক কিছু কেড়ে নেয়, কিন্তু দিন শেষে এমন অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও রোমাঞ্চটাই ফুটবলারদের ফিরিয়ে দেয় একটি বিশ্বকাপ!

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসঘানার ওঝার মন্ত্র আর হ্যারি কেইন