বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে সপ্তাহ তিনেক হতে চলল। কিন্তু এর রঙিন সব স্মৃতি যেন এখনো টাটকা। গ্যালারিতে উন্মাদনা, মাঠে পারফরম্যান্সের ঝলক, আর জয়ের পর উল্লাস। কিন্তু এই জমকালো আলোর নিচে যে থমথমে অন্ধকার জমে ছিল, ফুটবল বিশ্ব তা হয়তো এতটা টের পায়নি। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের নিরাপত্তাব্যবস্থা যেন ঝুলছিল একটা সুতোয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও অংশ নেওয়া দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি) বিশ্বকাপজুড়ে প্রতিদিন নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেই গোপন নথির একটি অংশ প্রকাশ করেছে স্পেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম প্রেনসা ইবেরিকার অনুসন্ধানী অপরাধবিষয়ক চ্যানেল। সেখান থেকেই জানা গেছে, বিশ্বকাপের অনেক তারকা ফুটবলার, কোচ ও রেফারিরা পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রাণনাশের হুমকি ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপের আগে ও টুর্নামেন্ট চলাকালে ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচের দিন। টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে পুলিশকে ফোন করে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি ও তাঁর দুই সঙ্গী ‘হাতে বানানো বোমা ও এআর-১৫ সেমিঅটোমেটিক রাইফেল’ নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁরা পুলিশ ও দুই দলের খেলোয়াড়দের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে ওই কথিত সন্ত্রাসীর মূল লক্ষ্য ছিলেন মেসি।

আর্জেন্টিনার আরেকটি ম্যাচের আগেও ছড়িয়েছিল বোমাতঙ্ক। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘আমি আটলান্টা স্টেডিয়ামে ঢুকতে যাচ্ছি। নিজের শরীরে চারটা বোমা বেঁধে উড়িয়ে দেব মেসিকে।’
ম্যাচ চলার সময়ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ফোন আসে। বলা হয়, স্টেডিয়ামের তিনটি ডাস্টবিনে ‘তিনটি বোমা’ রাখা আছে। এরপর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে পুরো স্টেডিয়ামে ব্যাপক তল্লাশি চালাতে হয়।
আর্জেন্টিনার মহারাতকাকে ঘিরে যখন বোমাতঙ্ক, তখন পর্তুগালের তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ভুগেছেন লাগাতার হয়রানির আতঙ্কে। গত ১৪ জুন ফিফার এক কর্মী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি রোনালদোর থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর ‘খোঁজখবর’ নিচ্ছেন। ১৬ জুন হিউস্টনে পর্তুগাল দল যে হোটেলে উঠেছিল, সেখান থেকে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

কানাডার টরন্টোতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। রোনালদোর কাছে যেতে এক অনুরাগী তাঁর সঙ্গে লিফটে ঢোকার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে আটকে দেন। পরে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি সিআর সেভেনের সঙ্গে একটি সেলফি তুলতে চেয়েছিলেন। মায়ামিতেও রোনালদোকে ঘিরে ধরার চেষ্টা হয়। পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচে রোনালদোর জার্সি পরা এক দর্শক তো সোজা মাঠেই নেমে পড়েন।
শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, মাঠের পারফরম্যান্স বা ভুলের কারণেও খেলোয়াড়দের পেতে হয়েছে হাড়হিম করা হুমকি। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ার পর রিয়াল মাদ্রিদের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও এমবাপ্পেকে নিয়ে কটূক্তি করা হয়। ৫ ও ৬ জুলাই প্যারাগুয়েতে তাঁর প্রতিকৃতি পোড়ানো হয়। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ফুলহামের মূল দলে নয়, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফারহানের ঠিকানা এবার বোরহাম উডসুযোগ নষ্ট বা পেনাল্টি মিসের মতো মাঠের ভুলের খেসারতও দিতে হয়েছে প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে। আতলেতিকো মাদ্রিদের নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট করার পর তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
পেনাল্টি মিস করার পর কলম্বিয়ার ফুটবলার জামিনটন ক্যাম্পাজ বিশ্বকাপ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে দেশে ফিরতেও পারেননি। স্পেন ও ফ্রান্সের ম্যাচে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে পেনাল্টি দেওয়ায় ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়েও পেয়েছেন মারাত্মক হুমকি।
সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া দল। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পর কোচ হং মাইওং-বো ও পুরো দলকে একযোগে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। তাঁদের বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হয়েছিল কড়া পুলিশ প্রহরায়।
তবে হুমকির সংখ্যার দিক থেকে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ার। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার বিতর্কিত ম্যাচের পর তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রায় ‘ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা’ পাঠানো হয়। এসব বার্তার সিংহভাগই ছিল মিসরীয় নাগরিকদের কাছ থেকে।
শুধু লেতেক্সিয়ার নন, ওই ম্যাচে ভিএআর দায়িত্বে থাকা ফরাসি রেফারি উইলি দেলাজোদকেও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে ফ্রান্সে এই দুই রেফারির বাড়ি ও স্বজনদের নিরাপত্তার জন্য আলাদা পুলিশি পাহারা বসাতে হয়েছিল।
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের বলটির দাম উঠতে পারে ১২৩ কোটি টাকা







