ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। বাংলাদেশ, ভারত বা ইন্দোনেশনের মতো দেশগুলোতে লাখো মানুষ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দলের জার্সি পরে খেলা উপভোগ করেন। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ১০টি দেশের মধ্যে আটটিই এবারের বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল এবারের বিশ্বকাপে খেলছে। রাশিয়া ও নাইজেরিয়া অতীতে একাধিকবার বিশ্বকাপে অংশ নিলেও এবার নেই। চীন ও ইন্দোনেশিয়া মাত্র একবার করে বিশ্বকাপে খেলেছে। অন্যদিকে ভারত, বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া ও পাকিস্তান এখনও বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নই দেখছে। যদিও ১৯৫০ সালে ভারত বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল, তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই দলটি সরে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় জনসংখ্যা থাকলেই ফুটবলে সফল হওয়া যায় না। জনসংখ্যার পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নত অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ সুবিধা, প্রতিভা খুঁজে বের করার কার্যকর ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের ফুটবল সংস্কৃতি।

ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও সকারনমিকস বইয়ের সহ-লেখক স্টেফান শিমানস্কির মতে, সফল ফুটবল দেশের বেশিরভাগই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলছে। তার ভাষায়, খেলোয়াড় তৈরির জন্য শুধু জনসংখ্যা নয়, প্রয়োজন বিনিয়োগ, অভিজ্ঞতা ও সঠিক পরিকল্পনা।

তবে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয় থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপে আটটি শিরোপা জিতেছে। শিমানস্কির মতে, এর কারণ শত বছরেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী ফুটবল ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা।

ছোট জনসংখ্যা নিয়েও উরুগুয়ে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে। মাত্র ৩৫ লাখ মানুষের দেশটি ১৯০২ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলছে। অন্যদিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে ফুটবলের বিকাশ অনেক পরে হওয়ায় তারা এখনও পিছিয়ে রয়েছে।

ইথিওপিয়া কখনও বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। দেশটির ফুটবল এখন তীব্র অর্থসংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যার মুখে। পর্যাপ্ত স্টেডিয়াম না থাকায় জাতীয় দলকে ঘরের ম্যাচও বিদেশে খেলতে হচ্ছে।

ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে অনেকেই ক্রিকেটের জনপ্রিয়তাকে ফুটবলের উন্নয়নে বাধা হিসেবে দেখেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্রিকেট নয়, মূল সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ঘাটতি এবং শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো না থাকা।

চীনের অবস্থাও ব্যতিক্রম নয়। বিপুল বিনিয়োগ করেও দেশটি ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ফুটবল পরিচালনায় পেশাদার সিদ্ধান্তের অভাব এর অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া ১৯৩৮ সালের পর এবার বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ পর্ব পর্যন্ত উঠলেও দলে ইউরোপে জন্ম নেওয়া ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এবারের এশিয়ান বাছাইপর্বে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপে খেলার জন্য শুধু জনসংখ্যা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী ঘরোয়া লিগ, আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং প্রতিভা বিকাশের কার্যকর উদ্যোগ। আর সেই ভিত্তি তৈরি না হলে কোটি কোটি সমর্থক থাকলেও বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

তবে মাঠে নিজেদের দল না থাকলেও বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপের আনন্দ থেকে দূরে থাকতে চান না। প্রিয় বিদেশি দলকে সমর্থন করেই তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব উপভোগ করে চলেছেন।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম