বিশ্বকাপে প্রিয় দলের জয় যেমন মুহূর্তের জন্য আনন্দ এনে দেয়, তেমনি হার অনেক সমর্থকের মনে গভীর হতাশা তৈরি করে। এমনকি গবেষণা বলছে, প্রিয় দলের পরাজয় শুধু মন খারাপই নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ফিফা বিশ্বকাপ শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরই নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগেরও কেন্দ্র। টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম বা নিখুঁত ঘাসের মাঠের রহস্য নিয়ে যেমন আলোচনা হয়, তেমনি এই টুর্নামেন্ট সমর্থকদের মন ও আচরণের ওপর যে গভীর প্রভাব ফেলে, সেটিও কম বিস্ময়কর নয়।
সম্প্রতি সাইকোলজি টুডে-তে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিশ্বকাপে প্রিয় দলের জয়-পরাজয় শুধু আবেগ নয়, মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
প্রিয় দল হারলে শুধু মনই খারাপ হয় না
যারা নিজের প্রিয় দলকে খুব গভীরভাবে সমর্থন করেন, তাদের কাছে দলের জয়-পরাজয় ব্যক্তিগত অনুভূতির মতোই হয়ে ওঠে। দল জিতলে আনন্দ, আর হারলে হতাশা—এটাই স্বাভাবিক। তবে গবেষণা বলছে, এর প্রভাব শুধু মানসিক নয়, শারীরিকও হতে পারে।
ফুটবল ম্যাচের ফলাফল নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয় দলের পরাজয়ের পর সমর্থকদের মধ্যে স্ট্রোক ও হৃদ্রোগজনিত সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। শুধু স্টেডিয়ামে ঝগড়া বা খারাপ মেজাজে বাড়ি ফেরা নয়, হতাশার প্রভাব শরীরেও পড়তে পারে।
জয়ের আনন্দও বেশিক্ষণ থাকে না
অন্যদিকে, প্রিয় দলের জয় অবশ্যই সমর্থকদের ভালো অনুভূতি দেয়। তবে সেই সুখও খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না। একটি গবেষণায় আগের এক বিশ্বকাপে জার্মানির জয় নিয়ে সমর্থকদের অনুভূতি বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, দল জিতলে তাদের মানসিক স্বস্তি ও সুখের অনুভূতি বেড়ে যায়। শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারালে সেই আনন্দ আরো বেশি হয়, আর ড্র করলে উল্টো ভালো থাকার অনুভূতি কমে যায়।
তবে এই ইতিবাচক প্রভাব খুব অল্প সময়ের। গবেষকদের মতে, পরদিন সকালেই সেই অতিরিক্ত আনন্দের প্রভাব প্রায় পুরোপুরি মিলিয়ে যায়। এর প্রভাব শুধু একজন সমর্থকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি দেশের মানুষের সম্মিলিত অনুভূতিকেও প্রভাবিত করে।
দীর্ঘদিনের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বকাপ এমন একটি ঘটনা, যা যুদ্ধ বা রাষ্ট্রপ্রধানদের মতোই মানুষের সম্মিলিত স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। এমনকি মানুষকে শুধু নিজের দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল—এই স্মৃতিটুকু মনে করিয়ে দিলেও তাদের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও দেশের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের অনুভূতি বেড়ে যায়।
খেলাধুলা যেমন এক করে, তেমনি বিভাজনও বাড়াতে পারে
খেলাধুলা মানুষকে একত্র করে; এটা বহুদিনের প্রচলিত ধারণা। তবে গবেষকেরা বলছেন, এর একটা উল্টো দিকও আছে। অলিম্পিক নিয়ে করা একটি গবেষণায় উঠে এসেছে ‘অলিম্পিক প্যারাডক্স’ নামে একটি ধারণা। অর্থাৎ, বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর যেমন মানুষকে একত্র করতে পারে, তেমনি দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা কখনো কখনো সামাজিক বিভাজন ও পূর্বধারণাকেও বাড়িয়ে দেয়।
ওই গবেষণায় দেখা যায়, অলিম্পিক চলাকালে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ নেতিবাচকভাবে দেখা হয় এমন একটি বহিরাগত গোষ্ঠী—এই ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের—সহায়তা করার প্রবণতা কম দেখিয়েছেন এবং তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণও তুলনামূলক বেশি করেছেন। তবে একই ধরনের প্রভাব অন্য সব গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে দেখা যায়নি; যেমন কানাডীয়দের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় ক্রীড়া আসর মানুষের আবেগ, জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক আচরণে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। তাই এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এর মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে








