বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা, রোমাঞ্চকর এবং একই সাথে চরম বিতর্কিত এক রূপকথার জন্ম দিল বেলজিয়াম। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে, ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র ৪ মিনিট আগেও খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা এক দল কীভাবে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করতে পারে, ফুটবল বিশ্ব তা দেখল আরেকবার।

তবে এই মহাকাব্যিক কামব্যাকের সমান্তরালে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভিএআর বিতর্কের একটিও জন্ম নিয়েছে এই ম্যাচে। অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে ১২৫তম মিনিটে ইউরি টিলেমানসের করা গোলটি এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দেরিতে হওয়া গোলের নতুন রেকর্ড।

৮৬ মিনিট পর্যন্ত সেনেগালের রাজত্ব ম্যাচের প্রথমার্ধ থেকে শুরু করে ৮৬ মিনিট পর্যন্ত মাঠের গল্পটা ছিল কেবলই আফ্রিকার সিংহদের। বেলজিয়ামের চেনা ছন্দকে বোতলবন্দি করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছিল সেনেগালে। সাদিও মানে, ইলিমান এনদিয়ায়ে এবং বিশেষ করে ইসমাইলা সারের গতি ও ড্রিবলিংয়ের সামনে বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ বারবার ভেঙে পড়ছিল। মাঝমাঠে হাবিব দিয়ারা, পাপে গেইয়ে এবং ইদ্রিসা গেইয়ে যেন এক অভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন। বেলজিয়ামের কোনো আক্রমণই তারা দানা বাঁধতে দেননি।

প্রথমার্ধেই হাবিব দিয়ারার দারুণ এক গোলে এগিয়ে যায় সেনেগাল। বিরতির পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইসমাইলা সার। স্কোরলাইন তখন ২-০। সেনেগালের জয় যখন কেবল সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় ফুটবলের চিরন্তন অনিশ্চয়তার খেলা।

বেলজিয়ামের ১৫৯ সেকেন্ডের ম্যাজিক  ৮৬ মিনিট পর্যন্ত শান্ত থাকা বেলজিয়াম হঠাৎ করেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। প্রথমে রোমেলু লুকাকু এক গোল শোধ করে বেলজিয়াম শিবিরে আশা জাগান। আর তার ঠিক ১৫৯ সেকেন্ডের মাথায় লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে সমতা ফেরান ইউরি টিলেমানস। চোখের পলকে ম্যাচের স্কোরলাইন হয়ে যায় ২-২! ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

১২৫তম মিনিটের সেই বিতর্কিত পেনাল্টি অতিরিক্ত সময়ের খেলা যখন শেষের দিকে, সবাই যখন মানসিকভাবে টাইব্রেকারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় ও বিতর্কিত ঘটনাটি। বক্সে একটি নিচু ক্রস ক্লিয়ার করতে যান সেনেগালের ডিফেন্ডার লামিন কামারা। একই সময়ে বলের দিকে এগিয়ে আসছিলেন বেলজিয়ামের ইউরি টিলেমানস। কামারার ডান পা টিলেমানসের বাম পায়ে আলতো স্পর্শ করেছিল কি না, তা নিয়েই শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। প্রথমে রেফারি সাঈদ মার্তিনেজ খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইশারা দিলেও, পরবর্তীতে তাকে ভিএআর রিভিউ দেখার জন্য ডাকেন ভিডিও রেফারিরা। অন-ফিল্ড মনিটরে বারবার রিপ্লে দেখে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। আর এই পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

রিপ্লেতে দেখা গেছে লামিন কামারার বুটের স্পাইক টিলেমানসের পায়ে সামান্য স্পর্শ করেছিল। আধুনিক ফুটবলের ‘কন্টাক্ট’ নিয়মানুযায়ী ডি-বক্সের ভেতর এমন চ্যালেঞ্জকে পেনাল্টি দেওয়া ভুল নয়। তবে বিশ্বকাপের নকআউটের মতো ম্যাচে, ১২৫ মিনিটে এত ‘সফ্ট’ বা হালকা কন্টাক্টের জন্য পেনাল্টি দেওয়াটা বড্ড নিষ্ঠুর।   কামারা প্রথমে বল ক্লিয়ার করার চেষ্টা করেছিলেন এবং টিলেমানস নিজেই শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। আফ্রিকা গণমাধ্যমের দাবি ভিএআর-এর এই সিদ্ধান্ত সেনেগালের কাছ থেকে ম্যাচটি ‘ছিনতাই’ করেছে।

এই সিদ্ধান্তের পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন সেনেগালের ফুটবলাররা। রেফারির চারপাশ ঘিরে ধরে চলে তীব্র প্রতিবাদ। ম্যাচ এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে পেনাল্টি শটটি নিতে ৭ মিনিটেরও বেশি সময় নষ্ট হয়। সেনেগালের ডিফেন্ডার পাথে সিস তো পেনাল্টি স্পটের ওপরেই চোট পাওয়ার ভান করে শুয়ে পড়েন, যাতে বেলজিয়ামের পেনাল্টি টেকার মানসিকভাবে চাপে পড়েন।

ঠিক এই জায়গাতেই বেলজিয়াম দেখায় তাদের পেশাদারিত্ব। প্রথমে রোমেলু লুকাকু বলটি হাতে নিয়ে পেনাল্টি স্পটের দিকে এগিয়ে যান, যাতে সেনেগালের সব স্লেজিং এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ তার ওপর আসে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি ঠান্ডা মাথায় বলটি আসল পেনাল্টি টেকার অধিনায়ক টিলেমানসের হাতে তুলে দেন। প্রচণ্ড চাপের মুখেও টিলেমানস চরম আত্মবিশ্বাসে বল জড়ান জালের ডান কোণের ওপরের অংশে।

সেনেগালের হৃদয়ভঙ্গ ৮৬ মিনিট ধরে অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলা সেনেগালের জন্য এই বিদায় ছিল চরম ট্র্যাজিক এবং কষ্টের। মাত্র কয়েক মিনিটের অসতর্কতা এবং একটি বিতর্কিত রেফারিংয়ের সিদ্ধান্ত তাদের সোনালী স্বপ্নকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। ম্যাচ শেষে সেনেগালের খেলোয়াড়দের মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। তবে এই হারের মাঝেও সেনেগালের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ইসমাইলা সার। টুর্নামেন্টে এটি ছিল তার টানা চতুর্থ গোল। সাধারণত ক্লাবে রাইট উইংয়ে খেললেও এই ম্যাচে তিনি খেলেন সেন্ট্রাল পজিশনে। পুরো ম্যাচজুড়ে তার গতি, ড্রিবলিং এবং বেলজিয়ামের ডিফেন্স চিরে ফেলার ক্ষমতা ছিল দেখার মতো। প্রথমার্ধেই তার দুটি শট পোস্টে লেগে ফিরে না আসলে ম্যাচের ভাগ্য অন্যরকম হতে পারত। একটি অসাধারণ গোল এবং পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার পরও তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে পরাজিত দলের সদস্য হিসেবে। নিঃসন্দেহে, এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা অথচ ‘আন্ডাররেটেড’ বা অবমূল্যায়িত পারফর্মার হিসেবে নিজের নাম খোদাই করে গেলেন সার।

 ২০১৮ বিশ্বকাপের চেয়েও বড় নাটক এই ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের মনে করিয়ে দিয়েছে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের কথা। সেবারও শেষ ষোলোর ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতেছিল বেলজিয়াম। তবে রোমাঞ্চ আর বিতর্কের দাঁড়িপাল্লায় এবারের জয়টি আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেল। ইতিহাসের পাতায় বেলজিয়ামের এই কামব্যাক যেমন লেখা থাকবে, তেমনি ১২৫ মিনিটের সেই পেনাল্টির বিতর্কও ফুটবল পাড়ায় ঝড় তুলবে বছরের পর বছর।