উম্মে হাবিবা কনা
সাবধানে পা ফেলছেন তো? পৃথিবীতে মানুষরূপী অনেক জানোয়ার আছে। একটু সুযোগ পেলেই বিষধর সাপের মতো ছোবল মারতে পারে। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ছিঁড়ে খেতে পারে। অথচ তাদের অবয়ব দেখে চেনার উপায় নেই। সম্রাট, মুখোশের আড়ালে তেমনই একজন ভণ্ড, প্রতারক। একজন ব্ল্যাকমেইলার। কারো আবেগ-অনুভূতি, কারো আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে সে ব্ল্যাকমেইল করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করে। মিথিলা, নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে পা দেয় সম্রাটের পাতা ফাঁদে। সম্রাট মিথিলাকে ব্ল্যাকমেইল করে। মিথিলার সুন্দর, সম্ভাবনাময় জীবন হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। মিথিলা এবং মিথিলার মতো অসংখ্য মেয়েকে ব্ল্যাকমেইল করার কাহিনি নিয়ে লেখা কথাসাহিত্যিক জিল্লুর রহমানের উপন্যাস ‘ব্ল্যাকমেইলার’।
আমাদের সমাজে মেয়েদের এখনো ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হয়। কিছু মানুষ আছেন, যারা ভদ্রতার মুখোশ পরে সভ্য সমাজে বাস করেন। তাদের কাজ-কর্ম দ্বারা মেয়েরা ভুল পথে চালিত হয়। তাদের বিশ্বাস করে মেয়েরা ঠকে যায়, মিথ্যা আশ্বাসে সর্বস্ব হারায়, কলুষিত করে জীবনকে।
কথাসাহিত্যিক জিল্লুর রহমানের ‘ব্ল্যাকমেইলার’ তেমনই একটি উপন্যাস। এখানে ষাট বছর বয়সী সম্রাট তার সম্রাজ্ঞী বানাতে চায় ১৮ বছরের তরুণী মিথিলাকে। এখানে প্রধান চরিত্র মিথিলা মিডিয়ায় কাজ করতে আগ্রহী। সে প্রতিষ্ঠিত হতে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে মিডিয়া পাড়ায় ঘুরতে থাকে। ফেসবুক ঘেঁটে পরিচিত হয় হীরা নামের ডিরেক্টরের সাথে। তার মাধ্যমে পরিচয় হয় মানুষরূপী ভয়ংকর পিশাচ সম্রাটের সাথে। বাবার বয়সী এই প্রোডিউসার তাকে অসামান্য ভোগান্তিতে ফেলে জীবন নরক করে দেয়। যে কি না স্বপ্ন দেখায় নায়িকা হওয়ার, টিভিতে-ইউটিউবে নাটক প্রচার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর করে তোলে মিথিলাকে। সে নিজের অজান্তে ফাঁদে পা দেয়। তারপর না হয় তার নায়িকা হওয়ার স্বপ্নপূরণ, আর না হয় তার মা-বাবার স্বপ্নপূরণ। মেয়েটি মরীচিকার পেছনে ছুটে ধোঁয়ার মাঝে হারিয়ে যেতে যেতে বাঁচার চেষ্টা করে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / অকায়শাস্ত্র: আপন সত্তার অনুভূতি
বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখা এবং বেঁচে ফেরা, ১৮ বছরের তরুণী কি পারে তার মা-বাবার বুকে ফিরতে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে বইটি পাঠ অতীব জরুরি। ভুল থেকে নেওয়া শিক্ষা কীভাবে মানুষকে পুনর্জীবন দেয়, চৌকষ করে তোলে। বইটি পড়লে ধারণা পাওয়া যাবে। জীবনে হেরে যেতে নেই, খড়কুটো আকড়ে ধরেও বেঁচে ফেরা যায়। সবমিলিয়ে অনেক শিক্ষণীয় একটি বই ‘ব্ল্যাকমেইলার’।
মিথিলা গ্রামের সহজ-সরল-মেধাবী অপূর্ব রূপবতী মেয়ে। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতো অভিনয় করে মিডিয়ায় নাম করবে। বাবাও ইন্সপায়ার করতো তাকে। কিন্তু এই ইন্সপায়ার মেয়েটার ক্ষতি বয়ে আনে। মারুফা বেগম মিথিলার মা, অনেক ভালোবাসতো এবং যত্ন নিতো মিথিলার। মায়েরা যেমন হয়ে থাকে আরকি। কিন্তু পুরো উপন্যাসে তাকে কাঁদতে আর দুশ্চিন্তা করতে দেখা গেছে। মাইদুল ইসলাম মিথিলার বাবা, পেশায় স্কুলশিক্ষক। ভালো যেমন বাসতেন; তেমনই মেয়েকে কঠোর শাসনেও রাখতেন। কিন্তু বেশি কঠোরতায় ভালো কিছু বয়ে আনে না। সেটাই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। সম্রাট উপন্যাসের খলনায়ক। তিনি মিডিয়ায় একজন প্রতিষ্ঠিত প্রোডিউসার এবং সফল ব্যবসায়ী। তবে তিনি ভীষণ রকমের নারী দেহ লোভী এবং মদ্যপান তার প্রিয় কাজ হলেও এমনভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতো যেন ফেরেশতা।
বইটি পড়ে অনেক বিষয় জানতে পেরেছি। আমাদের সমাজে চলমান যে সমস্যাগুলো রয়েছে কথাসাহিত্যিক জিল্লুর রহমান সেসবের প্রাঞ্জল বর্ণনা করেছেন। ভুল করা, ভুল থেকে বের হওয়া, ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে কতটা মানসিক-শারীরিক-সামাজিক ভোগান্তি হয়; সেসব সূচারুরূপে তুলে ধরেছেন লেখক। লেখকের উপন্যাসগুলোতে সমস্যা এবং বের হওয়ার উপায়গুলো গোছানোভাবে তুলে ধরা হয়। সামাজিক মেসেজ থাকে বরাবরই। থ্রিলারধর্মী বইটিতে খুন, অত্যাচার, মারধর, ব্ল্যাকমেইল, ধর্ষণসহ মাফিয়াদের জীবনধারা ও পরিশেষে মাস্টারপ্ল্যান করে পুলিশে দেওয়া এবং শাস্তি পাওয়া সুন্দর হয়েছে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী: নারীবাদের দ্বন্দ্বময় সংলাপ
বইয়ের মেইন থিমের সাথে মিলিয়ে নামকরণ করেছেন ব্ল্যাকমেইলার, পারফেক্ট নামকরণ। এ ছাড়া বইয়ের প্রচ্ছদ, বাইন্ডিং অনেক সুন্দর হয়েছে। তবে সবশেষে বলতে হয়, মেয়েদের আরও সাবধান হতে হবে। ক্ষণিক ভুলেই অনেক বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। শিশু-কিশোরী, তরুণী-বৃদ্ধা কেউ নিরাপদ নয় সমাজে। বইটি পড়ে গা শিউরে উঠেছে অনেকবার। আমাদের মেয়েদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে।
বই: ব্ল্যাকমেইলার
লেখক: জিল্লুর রহমান
প্রকাশক: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রচ্ছদ: আল নোমান
মূল্য: ৩৫০ টাকা।
এসইউ








