কুড়িগ্রামে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। এতে দুর্যোগের ক্ষতচিহ্ন এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে তীব্র নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, অন্যদিকে পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে শত শত হেক্টর ফসলি জমি। ফলে ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কা ও কৃষি ক্ষতির দ্বৈত সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন জেলার হাজারো মানুষ।
জানা গেছে, উজানের ঢল এবং নদ-নদীর পানি বাড়া-কমার প্রভাবে জেলার ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে মাঠজুড়ে দেখা যাচ্ছে নষ্ট হয়ে যাওয়া সবজি, আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন আবাদি ফসলের চিত্র।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার ভাঙন কবলিত ৪০টি পয়েন্টের মধ্যে ৩০টিতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। তবে অধিকাংশ স্থানে এখনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় নদী পাড়ের মানুষের উদ্বেগ কাটছে না।

সরেজমিনে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, ভূরুঙ্গামারী ও রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একের পর এক নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে নদী তীরবর্তী এলাকা। বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক পরিবার। অন্যদিকে আবাদি জমি গ্রাস করে নদী এখন অনেক জায়গায় বসতভিটার একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে দিন-রাত আতঙ্কে কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।
ভুক্তভোগীরা জানান, নদী ভাঙনের কারণে অনেকে জীবনে পাঁচ থেকে ১৫বার পর্যন্ত বসতভিটা হারিয়েছেন। এবার শেষ আশ্রয়টুকুও নদীগর্ভে চলে গেলে তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না। ফলে দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পাউবোর তথ্যমতে, জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে পাঁচটি প্রধান নদ-নদীর দুই তীরের মোট দৈর্ঘ্য ৩৭৪ কিলোমিটার। এরমধ্যে মাত্র ৬৬ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, পানি বাড়া-কমার কারণে বিভিন্ন নদীতে ভাঙন বেড়েছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ছয় কিলোমিটার এলাকার মধ্যে চার কিলোমিটারে কাজ চলছে। বাকি দুই কিলোমিটার এলাকায় কাজ করায় জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে কাজ চলছে।
অন্যদিকে, বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে জেলার কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়ে।
জেলার বিভিন্ন ঘুরে দেখা গেছে, পটল, মরিচ, বেগুন, আমনের বীজ তলা, পাটসহ বিভিন্ন সবজি ও আবাদি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু এক দফা বন্যাতেই তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের শুলকুর বাজার এলাকার কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, বন্যার পানিতে আমার বিভিন্ন ধরনের সবজি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এত বড় ক্ষতির পর কি করব বুঝতে পারছি না। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

একই এলাকার কৃষক আবু মিয়া বলেন, আমার ২০ শতক জমির বেগুন ও পটলের ক্ষেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় জেলায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নির্ধারণের কাজ চলছে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা পানি নেমে যাওয়ার পর মরিচ, বেগুন, শসা ও বিভিন্ন শাকজাতীয় ফসলের আবাদ করতে পারেন। তা সম্ভব না হলে মাষকলাই একটি লাভজনক ফসল বিকল্প হিসেবে চাষাবাদ করতে পারেন। এছাড়া আবারও বন্যার আশঙ্কা থাকায় উঁচু জমিতে আমনের বীজ তলা তৈরির পরামর্শ দেন তিনি। তবে পাট বড় হয়ে যাওয়ায় এ ফসলের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রোকনুজ্জামান মানু/কেএইচকে/এএসএম








