বাবার স্মৃতিচারণা করে প্লেয়ারস ট্রিবিউনে একটা লেখা লিখেছিলেন ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসন বেকার। পড়ুন নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।
বাবার তরুণ বয়সের একটা ছবি আমার মনে এখনো স্পষ্ট। স্মৃতি সাধারণত একটু ঝাপসা হয়। কিন্তু এটা আলাদা। এটা রঙিন। ওমে জড়ানো। প্রায় স্বপ্নের মতো।
আমার বয়স তখন সম্ভবত ৩। ভাই মুরিয়েলকে সঙ্গে নিয়ে বসার ঘরে একটা মিনি ফুটবলে লাথি মারছিলাম। ওর বয়স তখন ৮। সারা দিন ভাইয়ের পিছু পিছু ঘুরতাম। সবাই বলত, আমি নাকি ওর কোমরে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
সারা দিনের খাটুনি শেষে মাত্রই বাসায় ফিরেছেন বাবা, সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছেন। ব্রাজিলে শোয়ার এই ভঙ্গিটা বেশ পরিচিত—মাথার নিচে বালিশ দিয়ে সোফায় শুয়ে ডান হাতটা এক পাশে ঝুলিয়ে দেওয়া। এমন সময় আমি আর মুরিয়েল ছুটে গিয়ে বাবাকে ধরে ঝাঁকি দিতে শুরু করি, ‘বাবাআআআ! এসো না!’
কিছুক্ষণ অনীহার ভান করেন বাবা। তারপর সোফা থেকে গড়িয়ে কার্পেটে নেমে আসেন। গড়াতে গড়াতে সোফার নিচে অদৃশ্য হয়ে যান। শুধু দেখা যায় অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা দুটো বড় বড় হাত পাগলের মতো নড়াচড়া করছে। ‘আজ তোমরা একটা গোলও দিতে পারবে না। আজ আমি (ব্রাজিলের বিখ্যাত গোলরক্ষক ক্লদিও) তাফারেল!’
খেলোয়াড়দের ছবি জমানো ছেলেটিই এখন ক্যামেরা হাতে বিশ্বকাপের মাঠেএটাই যেন বিশ্বকাপ ফুটবল। কার্পেট আমাদের মাঠ, সোফার নিচের ফাঁকা জায়গাটা গোলপোস্ট। আর বাবার ওই বড় বড় হাত দুটো হলো তাফারেল।
আমার ভাই কখনো রিভালদো, কখনো বেবেতো, কখনো রোনালদো সাজত। অবশিষ্টরা জুটত আমার কপালে (ছোট ভাইদের বেলায় যা হয় আরকি)।
স্মৃতিটা এত জীবন্ত যে মনে হয় আজও আমি এর গন্ধ পাই। সোফার গন্ধ। মা যে রাতের খাবার রান্না করছেন, সেই খাবারের গন্ধ। বাবার জামার গন্ধ।
আমি দেখতে পাই তাঁর বড় বড় হাত দুটা এদিক-ওদিক নড়ছে, যেন বিশ্বকাপ ফাইনালের কোনো পেনাল্টি ঠেকানোর চেষ্টা। মাঝেমধ্যেই তিনি সোফার নিচ থেকে মাথা বের করে জোকারদের মতো মুখভঙ্গি করতেন। আমি আর আমার ভাই হেসে লুটোপুটি খেতাম।
যেদিন খবর পেলাম বাবা মারা গেছেন, আমি তখন ঘর থেকে এক মহাসমুদ্র দূরে। লিভারপুলে। ২০২০-২১ মৌসুমের খেলা চলছিল। তাঁর মৃত্যুটা ছিল আকস্মিক। বিরাট ধাক্কা। মা ফোন করে বললেন, একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমাদের বাড়ির পাশের লেকে বাবা ডুবে গেছেন।

বাবাও একজন গোলরক্ষক ছিলেন। এটা বোধ হয় আমাদের ডিএনএতেই আছে। মাঠের ভেতর তাঁর নাকি বিন্দুমাত্র ভয় ছিল না। তেড়ে গিয়ে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের বুটের সামনে মুখ বাড়িয়ে দিতেন। বাবার বন্ধুরা বলত, ‘তোর বাবা একটা পাগল!’
বাবা যখন মারা গেলেন, আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। ফুটবলের কথা ভাবতে পারছিলাম না। অথচ আমরা তখন সেরা ৪-এ থাকার লড়াই করছি। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছিল, কারণ সেটা মহামারির সময়। বাড়ি ফেরার যাত্রা এক দুঃস্বপ্নের মতো। এদিকে আমার স্ত্রী নাটালিয়ার গর্ভে তখন আমাদের তৃতীয় সন্তান। ডাক্তার বলেছিলেন, ভ্রমণটা ওর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। বাবা সব সময় বলতেন, নাটালিয়াকে তিনি আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তাই নাটালিয়ারও ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।

আমাকে একাই ব্রাজিলে যেতে হতো। কিন্তু পরিস্থিতিটাই ছিল অসম্ভব, কারণ ওই সময়ে দেশের বাইরে গেলে ফেরার পর বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিন হোটেলে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হতো। বাবার শেষকৃত্য থেকে ফিরে একা একা হোটেল রুমে দুই সপ্তাহ বন্দী থাকার কথা ভাবতেই পারছিলাম না। এই দীর্ঘ সময় স্ত্রীকে একা রাখব কীভাবে? ওর তখন শেষ তিন মাস চলছে।
মা আর ভাইকে ফোন করে পরিস্থিতিটা বোঝালাম। সেটাই ছিল আমার জীবনের নিষ্ঠুরতম ফোনকল। আমরা অনেক কেঁদেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত না যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিলাম। বাবাও চাইতেন, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, আমি যেন আমার সন্তান ও তাঁর ‘প্রিয় মেয়ের’ (নাটালিয়া) পাশে থেকে ওদের আগলে রাখি। তাই বাবাকে সম্মান জানানোর এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় ছিল না।
বাবার শেষকৃত্য দেখতে হয়েছিল ফেসটাইমে। অনুষ্ঠানজুড়ে আমার ভাই ফোনটা ধরে রেখেছিল। আর আমি লিভারপুলে বসেই মায়ের সঙ্গে প্রার্থনা করছিলাম, কাঁদছিলাম।
শেষকৃত্যের কয়েক দিন পর যখন আবার অনুশীলনে ফিরলাম, হুটহাট বাবার কথা মনে পড়ে যেত। সামলাতে পারতাম না। মাঠে দাঁড়িয়েই কাঁদতে শুরু করতাম। ভাবুন তো, ফ্রি-কিক আটকানোর জন্য ডিফেন্ডাররা দেয়াল তৈরির চেষ্টা করছে, আর এদিকে আপনার চোখ তখন ঝাপসা হয়ে আছে কান্নায়!
কীভাবে দুশ্চিন্তামুক্ত থেকেছেন পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীরকিন্তু আমার সতীর্থরা ছিল অসাধারণ। ওরা এমন আচরণ করত, যেন ওরাও আমার পরিবারেরই অংশ। আবার খেলায় ফিরতে পারায় আমার মন একরকম শান্ত হয়েছিল। সব সময় বলি, ফুটবলকে আমি নিজে বেছে নিইনি। অবচেতন মনে যা লুকিয়ে আছে, যা ইতিমধ্যে আপনার হাড়ে–মজ্জায় মিশে গেছে, তা আপনি বেছে নিতে পারেন না।
ব্রাজিলে ফুটবল একটা ঢেউয়ের মতো, যার ওপর আপনাকে সওয়ার হতেই হবে। মাঠে ফেরাটা আমাকে মানসিক শান্তি দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল ঢেউয়ে চড়েই অবশেষে শান্ত জলে এসে পৌঁছালাম।
যখন অনুশীলন শেষে বাড়ি ফিরতাম, ভীষণ ক্লান্ত লাগত। ইচ্ছে করত সোফায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ি, ঠিক আমার বাবার মতো। আমার ছেলেও নিয়ম করে ঘড়ির কাঁটার মতো ঠিক এই সময়ই ছুটে এসে বলটা আমার হাতে গুঁজে দিত। বলত, ‘চলো! খেলি!’
আমরা প্রথমে সোফার নিচের ফাঁকা জায়গাটাকে গোলপোস্ট বানিয়ে খেলা শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরে ও বায়না ধরে জোর করে একটা ‘সত্যিকার গোলপোস্ট’ কিনিয়ে ছেড়েছে। সোফার সামনে সেই মিনি গোলপোস্ট বসানো হয়েছে। মেঝেতে শুয়ে পড়ে আমি ওকে আটকানোর চেষ্টা করি, ঠিক যেভাবে বাবা আমাকে আটকানোর চেষ্টা করতেন।
কার্পেটটাই আমাদের মাঠ। আমার ছেলে কখনো সালাহ, কখনো ট্রেন্ট বা ভিনি জুনিয়র সাজে। আমি ওকে সব সময় বলি যে আমি ‘তাফারেল’ হতে চাই। কিন্তু আমাকে হতে হয় ‘আলিসন’। যেন আবারও সেই পুরোনো ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যেন সেই পুরোনো গল্পের বইটাতেই যোগ হচ্ছে নতুন পৃষ্ঠা।








