রাজধানীতে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অনেক যাত্রী রিকশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এই সুযোগে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে রিকশাচালকদের বিরুদ্ধে। 

অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে যাত্রীদের মধ্যে। তবে রিকশাচালকদের দাবি, জলাবদ্ধ সড়কে বাড়তি ঝুঁকি, শ্রম ও সময়ের কারণেই তারা বেশি ভাড়া নিচ্ছেন। ফলে বৃষ্টির দুর্ভোগের সঙ্গে এই বাড়তি ভাড়া রাজধানীবাসীর জন্য গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে। 

রবিবার (১২ জুলাই) রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, পল্টন ও শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে সড়কের অধিকাংশ এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী ও কর্মজীবী মানুষ। গণপরিবহন সংকটের সুযোগে অনেক রিকশাচালক স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন। জরুরি প্রয়োজনে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়ায় রিকশায় উঠছেন অনেকে। 

রাজধানীর সিটি কলেজ থেকে শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী নকিব তালুকদার। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, সিটি কলেজ থেকে শাহবাগের‌ স্বাভাবিক সময়ের ভাড়া সর্বোচ্চ ৫০ টাকা হতে পারে। আজ পানি জমে রাস্তা একাকার, কোনো বাস থামছে না। একটা রিকশা ডাকলাম, ১৫০ টাকা চাইলো। আমি ভাড়া ১০০ টাকা বলতেই মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলেন। বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ায় যেতে হচ্ছে। আমাদের এই অসহায়ত্ব দেখার যেন কেউ নেই।

রাজধানীর পল্টন এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী তারেকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন অফিসে থেকে বাসায় যেতে রিকশায় ৬০ টাকা লাগে। আজকে একই দূরত্ব যেতে ভাড়া চাইছে ২৫০ টাকা। আমি ২০০ পর্যন্ত বলছি, তাতেও রাজি হচ্ছে না। এখন বৃষ্টি আরো বাড়ছে। বৃষ্টির কারণে কষ্ট হচ্ছে ঠিক কিন্তু তিনগুণ ভাড়া নেওয়া তো অযৌক্তিক।

জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন শিক্ষক আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এখান থেকে ঢাবিতে যেতে ন্যায্য ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বৃষ্টির কারণে ৬০ থেকে ৭০ টাকা হতে পারে। সেখানে ১০০ টাকা ভাড়া চাওয়া জুলুম। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীরা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েন।

তবে অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ রিকশাচালকরা। প্রেসক্লাবের সামনে কথা হয় রিকশাচালক মো. রাজিব হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, পানির মধ্যে রিকশা চালানো খুব কষ্টের। অনেক সময় রিকশা ঠেলে নিতে হয়। পানি ঢুকে যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি শ্রম দিতে হয়। তাই কিছুটা বেশি ভাড়া চাই।

আরেক রিকশাচালক মো. সুমন মিয়া বলেন, সব চালক বেশি ভাড়া নেয় না। কিন্তু জলাবদ্ধ রাস্তায় যাত্রী তুলতে গেলে ঝুঁকি থাকে। কোথাও গর্ত, কোথাও ইঞ্জিনচালিত গাড়ির ঢেউয়ে রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়। এই কারণে অনেকেই বাড়তি ভাড়া দাবি করে।

নিউ মার্কেট এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক কুদ্দুস আলী‌। তিনি বলেন, সবাই খালি আমাদের বেশি ভাড়াই দেখে, আমাদের কষ্ট দেখে না। কোমর পানিতে রিকশা চালাইলে রাইতে জ্বরে শরীর কাঁপে। তাছাড়া মহাজনরে তো জমার টাকা ঠিকই দেয়া লাগে, তা তো মাফ নাই। রাস্তা ভালো থাকলে কি আমরা বেশি ভাড়া চাই? জীবনের ঝুঁকি নিয়া পানিতে নামি, তাই দুইটা টাকা বেশি নেই।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলাবদ্ধতা শুধু চলাচলের দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে না, বরং এটি নগরজীবনে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ধরনের ভোগান্তি থেকে নগরবাসীর মুক্তি মিলবে না।