একসময় ভারতীয় পাথরে ভরে থাকতো লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর। তবে গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ভারত থেকে পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় দেশের অন্যতম রাজস্ব আদায়কারী এই স্থলবন্দর এখন অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। ভারতীয় পাথরের সংকটে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। এ সুযোগে পাথরের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ভুটান। দেশটি থেকে সীমিত পরিসরে পাথর আমদানি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্যের মধ্যে পাথর, মৌসুমি ফল ও কয়লা (সীমিত আকারে) উল্লেখযোগ্য। আগে ভারতীয় ট্রাকগুলোতে গাড়িপ্রতি ৫০-৬০ টন পর্যন্ত পাথর আসত। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম খরচে বেশি পরিমাণ পাথর পেতেন। তবে সম্প্রতি ওভারলোডিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে ট্রাকপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ টন পাথর পরিবহনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে ভারত সরকার। ফলে আগের মতো অতিরিক্ত পাথর বহনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
‘দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দর-কষাকষি ও আলোচনার জটিলতার কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পাথর রপ্তানি কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন। অন্যদিকে বেশি দামে পাথর কিনতে আগ্রহী নন বাংলাদেশি আমদানিকারকরাও। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বুড়িমারী স্থলবন্দরে ভারতীয় পাথরের আমদানি বন্ধ রয়েছে’

এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দর-কষাকষি ও আলোচনার জটিলতার কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পাথর রপ্তানি কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন। অন্যদিকে বেশি দামে পাথর কিনতে আগ্রহী নন বাংলাদেশি আমদানিকারকরাও। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বুড়িমারী স্থলবন্দরে ভারতীয় পাথরের আমদানি বন্ধ রয়েছে।
আরও পড়ুন
পণ্য খালাসে জটিলতায় গতি হারাচ্ছে ভোমরা বন্দরের বাণিজ্য
এদিকে ভারতীয় পাথরের সংকটের সুযোগে বেড়ে গেছে ভুটান থেকে আমদানি হওয়া পাথরের দাম। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভুটান আগে থেকেই নির্ধারিত ওজন মেনে পাথর রপ্তানি করে আসছে। বর্তমানে ভুটানের তোর্শা এলাকা থেকে প্রতি টন পাথরের আমদানি মূল্য ১৫ ডলার এবং সামসি এলাকা থেকে ১৪ ডলার নির্ধারিত রয়েছে।
দুই-তিন মাস আগেও ভুটানের পাথর বাংলাদেশে বিক্রি হতো প্রতি টন দুই হাজার ৩০০ টাকা থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায়। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৭৫০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব পাথর ভেঙে বাজারজাত করতে অতিরিক্ত শ্রম, মেশিন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক ব্যবসায়ী ধীরে ধীরে এই বন্দরমুখী ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

‘দুই-তিন মাস আগেও ভুটানের পাথর বাংলাদেশে বিক্রি হতো প্রতি টন দুই হাজার ৩০০ টাকা থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায়। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৭৫০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব পাথর ভেঙে বাজারজাত করতে অতিরিক্ত শ্রম, মেশিন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক ব্যবসায়ী ধীরে ধীরে এই বন্দরমুখী ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন’
কাজ সংকটে শ্রমিকরা
ভারতীয় পাথরের আমদানি বন্ধ থাকায় স্থলবন্দরের লোড-আনলোড শ্রমিকদের মধ্যে কর্মসংস্থান সংকট দেখা দিয়েছে। এতে বন্দরে কর্মরত দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক আয়ের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন
স্থলবন্দরে নিষেধাজ্ঞা: প্রক্রিয়াজাত ফল রপ্তানিতে ক্ষতি
বুড়িমারী স্থলবন্দরের লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক আফিসার রহমান জাগো নিউজকে জানান, ভারতীয় পাথরের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের কাজের পরিমাণ অনেক কমে গেছে।
তিনি বলেন, আমাদের ১৪২টি গ্রুপে ১৫ জন করে শ্রমিক কাজ করেন। বর্তমানে দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক ভুটান থেকে আসা প্রায় ২০০টি পাথরবাহী ট্রাকের কাজ ভাগাভাগি করে করছেন। এতে শ্রমিকরা কিছুটা সংকটে পড়েছেন।
আরও পড়ুন
চাতলাপুর শুল্ক স্টেশন / অর্ধযুগ আমদানি নেই, বন্ধের পথে রপ্তানিও
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ভুটান থেকে প্রতিদিন ২০০টির মতো ট্রাক পাথর নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ২৫ টন পাথর থাকে। আগে কয়লা আমদানি হলেও সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। মৌসুমি ফলও শুধু মৌসুমের সময় আসে।

‘ভারতের বিভিন্ন কোয়ারি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে ভারতীয় সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। আমরা আশা করছি, খুব শিগগির দুই দেশের মধ্যে পাথর বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক হবে’
শুধু পাথর সংকটই নয়; সিন্ডিকেট, জায়গা সংকট, মহাসড়কে চাঁদাবাজি এবং সড়কের বেহাল অবস্থার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাও বন্দরের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এসব সমস্যা সমাধান না হলে রাজস্ব আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না।
আরও পড়ুন
কার্গো হ্যান্ডলিং / বেনাপোল বন্দরে ৪৯ কোটি টাকায় ঠিকাদার নিয়োগ দেবে সরকার
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৬ কোটি ৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭ কোটি ৮৪ হাজার টাকায়। আর ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৯০ কোটি ৬৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেসব পণ্য রপ্তানি হয়, তার মধ্যে কিছু পণ্য মাসে একবার কিংবা ১৫ দিন পরপর সীমিত আকারে পাঠানো হচ্ছে। এসব পণ্যের রপ্তানি আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস পণ্য, জুট ও জুটজাত পণ্য, প্রাণ গ্রুপের বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, হাটিলের ফার্নিচার, মেলামাইন সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংকস। তবে বর্তমানে এসব পণ্যও নিয়মিতভাবে না গিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর সীমিত পরিমাণে ভারতে যাচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় চাহিদা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকার পাথর ব্যবসায়ী ইলিয়াস আলী তুহিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরে আমাদের দেশে ভারতীয় পাথর আসছে না। ওভারলোডিং বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশে কোনো গাড়ি পাথর নিয়ে আসতে পারছে না। ভুটানের পাথরের দামও অনেক বেড়ে গেছে। যে দামে পাথর কিনে আনছি, সেই দামে দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারছি না। এতে আমরা ক্ষতির মুখে পড়েছি। বুড়িমারীর অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভারত থেকে আগের মতো গাড়ি না আসা পর্যন্ত বন্দরের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না।’
আরও পড়ুন
বেনাপোল বন্দর / কাস্টমসের জব্দ কোটি টাকার পণ্য গায়েব, কর্মকর্তাসহ ১৮ জনের মানে মামলা
বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাস্টমস ও ক্লিয়ারিং-ফরওয়ার্ডিং এজেন্টদের সংগঠন সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, ‘ভারতের বিভিন্ন কোয়ারি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে ভারতীয় সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। আমরা আশা করছি, খুব শিগগির দুই দেশের মধ্যে পাথর বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক হবে।’
ভারতীয় পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রভাব পড়েছে বরে জানান বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী কমিশনার মতলেবুর রহমান।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ৮৭ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯০ কোটিতে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে ভারতীয় পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রভাব পড়েছে।’
এসআর/জেআইএম








