সকালে ঘুম ভাঙার পর বিছানা থেকে নামতে গিয়েই বুঝলেন সর্বনাশটা হয়ে গেছে। পা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামা তো দূরের কথা, ঠিকমতো সোজা হয়ে দাঁড়াতেই শরীরের পেশিগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে উঠছে। অথচ গতকাল জিমে ঘাম ঝরানোর পর বা বহুদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার পর কিন্তু এতটাও খারাপ লাগছিল না। ব্যথাটা শুরু হলো ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পর।

যারা জীবনে কখনো ব্যায়াম করেছেন, তাঁরা ব্যায়ামের পরদিন শরীরের এই তীব্র ব্যথার সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ডমস্ (DOMS) বা ডিলেইড অনসেট মাসল সোরনেস। সাধারণ পেশিতে টানের সঙ্গে এর একটা বড় পার্থক্য আছে। জিমে বা মাঠে চোট পেলে আপনি সঙ্গে সঙ্গেই ব্যথা টের পাবেন। কিন্তু ডমসের বৈশিষ্ট্যই হলো, এটি আপনার শরীরে জেঁকে বসবে ব্যায়াম করার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর। কখনো কখনো এই ব্যথা টানা তিন-চার দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

কেন এমন হয়? একটা সময় পর্যন্ত কোচ এবং খেলোয়াড়দের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে পেশিতে ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়ার কারণেই এই ব্যথা হয়।

ডমসের বৈশিষ্ট্যই হলো, এটি আপনার শরীরে জেঁকে বসবে ব্যায়াম করার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর

আধুনিক বিজ্ঞান এই পুরোনো ধারণাকে পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে। আপনি ব্যায়াম শেষ করার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শরীর তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় ল্যাকটিক অ্যাসিড বের করে দেয়। তাহলে পরদিন সকালে পেশিতে ব্যথার আসল কারণ কী?

ব্যায়াম বা ছোটাছুটি করলে গা থেকে গন্ধ আসে কেন
যারা জীবনে কখনো ব্যায়াম করেছেন, তাঁরা ব্যায়ামের পরদিন শরীরের তীব্র ব্যথার সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ডমস্ বা ডিলেইড অনসেট মাসল সোরনেস।

এই ব্যথার জন্ম হয় পেশির তন্তুতে ঘটা এক ধরনের সূক্ষ্ম ভাঙনের কারণে। বিষয়টা একটু সহজ করে বলা যাক। আপনি যখন নতুন কোনো ব্যায়াম শুরু করেন, কিংবা হঠাৎ করে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেন, তখন আপনার শরীরের পেশিগুলোকে এমন এক ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার সঙ্গে তারা মোটেও অভ্যস্ত নয়। বিশেষ করে যখন পেশি প্রসারিত হওয়ার সময় তার ওপর ওজন বা চাপ পড়ে, তখন পেশির সূক্ষ্ম তন্তুগুলোতে ছোট ছোট ফাটল তৈরি হয়।

ভয় পাওয়ার কিছু নেই, পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার মতো কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনা এটি নয়। বরং পেশির এই আণুবীক্ষণিক ফাটলগুলোই আপনার শরীরকে শক্তিশালী করে তোলার প্রথম ধাপ।

হঠাৎ ব্যায়াম বাড়ালে, অভ্যস্ত না থাকায় পেশির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে

পেশির এই ফাটলগুলোর সংকেত যখন মস্তিষ্কে পৌঁছায়, শরীর তার নিজস্ব মেরামত প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। ফাটল মেরামত করার জন্য পেশির ওই নির্দিষ্ট অংশে প্রচুর পরিমাণে রক্ত, শ্বেত রক্তকণিকা এবং পুষ্টি উপাদান ছুটে যায়। এই হঠাৎ জমে ওঠা তরলের কারণে পেশিতে হালকা প্রদাহ তৈরি হয়। ওই জায়গাটা কিছুটা ফুলে যায় এবং ফুলে যাওয়া অংশটি পেশির ভেতরের ব্যথার স্নায়ুগুলোতে চাপ দেয়। ঠিক তখনই, অর্থাৎ ব্যায়ামের চব্বিশ ঘণ্টা পর আপনি ব্যথাটা অনুভব করতে শুরু করেন।

ব্যায়াম করার সময় হার্টরেট সর্বোচ্চ কত থাকা নিরাপদ
বিজ্ঞানীরা বলেন, ডমস হলে একেবারে শুয়ে-বসে না থেকে হালকা হাঁটাচলা বা স্ট্রেচিং করা উচিত। একে বলে অ্যাকটিভ রিকভারি। এতে পেশিতে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং শরীরের মেরামতির কাজটা দ্রুত হয়।

তাহলে এই কষ্টকর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার মানে কী? মানে লুকিয়ে আছে মানুষের শরীরের এক অসাধারণ ক্ষমতার ভেতর, যার নাম অ্যাডাপটেশন। অর্থাৎ, মানিয়ে নেওয়া। আপনার পেশি যখন বুঝতে পারে যে তাকে ভবিষ্যতে এ রকম আরও কঠিন চাপের মুখোমুখি হতে হবে, তখন সে পুরনো ফাটলগুলোকে মেরামত করে আগের চেয়ে আরও মোটা, মজবুত এবং শক্তিশালী তন্তু তৈরি করে। একে বলা হয় মাসল হাইপারট্রফি।

ফলে একই ব্যায়াম যখন আপনি কয়েক দিন পর আবার করবেন, তখন আর আগের মতো ব্যথা হবে না। শরীর ততদিনে নতুন নিয়মের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। সহ্যক্ষমতা এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়ে।

বিজ্ঞানীরা বলেন, ডমস হলে একেবারে শুয়ে-বসে না থেকে হালকা হাঁটাচলা বা স্ট্রেচিং করা উচিত

ব্যথা কমানোর জন্য অনেকেই পুরোপুরি বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবেন, যা আসলে ভুল। বিজ্ঞানীরা বলেন, ডমস হলে একেবারে শুয়ে-বসে না থেকে হালকা হাঁটাচলা বা স্ট্রেচিং করা উচিত। একে বলে অ্যাকটিভ রিকভারি। এতে পেশিতে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং শরীরের মেরামতির কাজটা দ্রুত হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিন যুক্ত খাবার খাওয়া এবং ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ পেশির মূল মেরামতের কাজটা ঘুমের ঘোরেই সবচেয়ে ভালোভাবে হয়।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস, আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিন এবং জার্নাল অব ফিজিওলজি

ব্যায়াম করেও কেন অনেকের ওজন কমে না