দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি আগামী ১৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে ইতিবাচক ফল পাওয়ার পর প্রথম ধাপে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এরপর পর্যায়ক্রমে অক্টোবরের শেষ নাগাদ দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়নে কার্যক্রম শুরু হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৪ বছরের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। তবে তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো-প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে সঠিকভাবে শনাক্ত করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদ্ধতিতে সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ফ্যামিলি কার্ডসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

মন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কোনো স্থির তালিকা নয়, এটি হবে একটি ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বা গতিশীল সামাজিক নিবন্ধন ব্যবস্থা। মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করা হবে। ফলে কোনো পরিবার দারিদ্র্য থেকে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তে উন্নীত হলে, আবার কোনো পরিবার নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়লে সেটিও নিবন্ধনে প্রতিফলিত হবে।

তিনি বলেন, অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগী বাদ পড়া এবং অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এ ধরনের দুর্বলতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত তথ্য সংশোধনের মাধ্যমে তালিকাকে হালনাগাদ রাখা হবে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, পরিবারের নারী সদস্যদের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছালে সেই অর্থ শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, হাঁস-মুরগি পালন, গাছ লাগানো, কুটিরশিল্প, সেলাই এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে বেশি ব্যয় হয়। এতে একদিকে যেমন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি ও দারিদ্র্য বিমোচনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মন্ত্রী জানান, দেশের ৫৬টি এলাকায় পরিচালিত পাইলট প্রকল্পে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। যশোর ও নেত্রকোনার দুটি এলাকায় তথ্য সংগ্রহে কিছু সমস্যা ধরা পড়লেও তা সংশোধন করা হয়েছে। বাকি ৫৪টি এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি এবং ত্রুটির হার ছিল ৩ শতাংশেরও কম। তিনি বলেন, ১৬ আগস্ট থেকেই নতুন প্রশ্নমালা ও নতুন পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ অনলাইনে তথ্য সংগ্রহ শুরু হবে। এরপর প্রতি মাসে তথ্য হালনাগাদ করা হবে। ফলে কারও মৃত্যু, ঠিকানা পরিবর্তন, আয়-রোজগারের পরিবর্তন বা অন্য কোনো সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন দ্রুত নিবন্ধনে যুক্ত করা সম্ভব হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের তদারকি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানান সমাজকল্যাণ মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকবেন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তারা। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বে কমিটি তথ্য যাচাই করবে, যেখানে আইসিটি ও পরিসংখ্যান কর্মকর্তারাও যুক্ত থাকবেন। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে পৃথক কমিটি কাজ করবে। জাতীয় পর্যায়ে অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও নিয়মিত কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন। তিনি আরও জানান, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয় তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করবে, যাতে একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নিতে না পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপে সারা দেশের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে তা হালনাগাদ হবে। নতুন কোনো দুর্বলতা বা ত্রুটি চিহ্নিত হলে দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।