‘৫০ টেহা হাজিরা থেকে কাজ করতাছি। অহন কাজের দাম তো বাড়তে, বাড়লেও আমরা তো যাইতারি না। আমগোরে তো নে না। আমরা বয়স্ক না, আমরারে বেড়ারা নে না। যারা ইয়ং বয়সের আছে, হেরারে নেয়।’ কথাগুলো বলছিলেন ৬৭ বছর বয়সী রাশিদা বেগম।
গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর বাড্ডার নতুন বাজারের শ্রমিক হাটে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। প্রায় ২৮ বছর ধরে এখানে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন তিনি। কিন্তু বয়সের ছাপ পড়ার পর থেকে আগের মতো আর কেউ কাজে নিতে চায় না। চার দিন ধরে প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো কাজ পাননি রাশিদা।
শুধু তিনি নন, একই অবস্থায় রয়েছেন এই শ্রমিক হাটে আসা আরও অনেক নারী-পুরুষ। সকাল সাতটা থেকে ১০টা পর্যন্ত এই শ্রমিক হাটে কয়েক শ শ্রমিকের উপস্থিতি দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। পুরুষ শ্রমিক বেশি হলেও নারী শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়।
সংসার চালানোই কঠিন
রাশিদা বেগমের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দায়। স্বামী আবদুর রহিম (৭৫) ও এক ছেলেকে নিয়ে বাড্ডার নূরে সালাহ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। তাঁর স্বামী আগে প্যাডেলরিকশা চালাতেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে এখন আর নিয়মিত চালাতে পারেন না।
সংসার কীভাবে চলছে, জানতে চাইলে রাশিদা বলেন, ‘সংসারডা চালাইতে অনেক কষ্ট অয়। আগে ৫০ টেহার কাম কইরা বাজার কইরা খাইতে পারছি। অহন ৫০০ টেহার কাম করলেও বাজার অয় না। কামে দুই দিন যাইতারলে চার দিন যাওন যায় না। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। কী করমু? না দিয়া তো উপায় নাই। কোনোমতে খাইয়া না খাইয়া দিন যায়।’
সরকারের বয়স্ক ভাতা কিংবা ফ্যামিলি কার্ড কোনোটিরই সুবিধা পান না বলে জানান তিনি। অভিযোগ করেন, বয়স্ক ভাতার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করতে গেলে তাঁকে সহযোগিতা না করে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর বাড্ডার নতুন বাজারের এই শ্রমিকের হাটে আগের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও কমেছে কাজের সংখ্যা। এমনটাই বলছেন রাশেদা বেগমের মতো দীর্ঘদিন এই হাটে আসা শ্রমিকেরা।
শুধু তিনি নন, একই অবস্থায় রয়েছেন এই শ্রমিক হাটে আসা আরও অনেক নারী-পুরুষ। সকাল সাতটা থেকে ১০টা পর্যন্ত এই শ্রমিক হাটে কয়েক শ শ্রমিকের উপস্থিতি দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। পুরুষ শ্রমিক বেশি হলেও নারী শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়।
প্রায় একই রকম অবস্থা সুরাইয়া বেগমের (৬৫)। বাসার রুম পরিষ্কার, পুরোনো ভবনের মেঝে ভাঙার কাজ, ধোয়ার কাজ করেন তিনি। গতকাল সকালেও কাজের খোঁজে এই মানুষ বিক্রির হাটে প্রতিদিনের মতো আসেন তিনি। ১৩ বছর ধরে এই শ্রমিকের বাজারে আসা সুরাইয়া সকাল ১০টা পর্যন্ত তখনো বিক্রি হননি। কখনো কাজ পান, কখনো আবার কাজ না পেয়ে বাসায় ফিরে যান বলে জানান এই নারী।
সুরাইয়ার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর। স্বামী নোয়াব আলী (৭০) শ্বাসকষ্টের কারণে কোনো কাজ করতে পারেন না বলে জানান সুরাইয়া। তাই এই বয়সে প্রতিদিন সকালে কাজের খোঁজে শ্রমিকের হাটে ছুটতে হয় তাঁকে।
কাজ না পাওয়ার কারণ হিসেবে সুরাইয়া বেগম উল্লেখ করেন, বয়স একটু বেশি হওয়ায় তাঁকে অনেকে কাজে নিতে চায় না। নিলেও অন্যরা যেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় কাজে যান, সেখানে সুরাইয়া বেগমকে যেতে হয় ৫০০ টাকায়।
বেড়েছে শ্রমিকের সংখ্যা, কমেছে কাজ
২০ বছর ধরে রাজধানীর বাড্ডার নতুন বাজারের এই শ্রমিকের হাটে সকালে কাজের খোঁজে আসেন মো. আশাদুল (৭৩)। ইট–বালু তোলার কাজ করেন তিনি। গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজরামপুর, থাকেন রাজধানীর খিলক্ষেতে।
আশাদুল বলেন, ‘আগে কাজকাম ছিল। ইদানীং কাজকাম নাই বললেই চলে। এখন আমাদের চলতে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। ধারকর্জ কইরা, দোকান বাকি কইরা চলতে সমস্যা হয়। এই যে ঘর ভাড়া দিতে পারি না। এক মাসের ঘর ভাড়া দিয়া সিধা (সোজা) অইতে পারি না, আরেক মাসের ঘর ভাড়া আইয়া পড়ে।’
কাজ কম থাকায় আয় কমে গেছে। ফলে রাজধানীতে পরিবারসহ থাকা অনেক বেশি কষ্টকর হয়ে গেছে। তাই স্ত্রী জোবেদা খাতুনকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে জানান আশাদুল।
খরচ বাড়ছে, আয় কমছে
একদিকে কাজ কমে গেছে, আর অন্যদিকে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল বেড়েছে বলে দাবি করেন শফিকুল ইসলাম (৫০)। রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকায় স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। প্রতি মাসে ১০ হাজর টাকা বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে হয় তাঁকে। প্রতিদিনের মতো এই শ্রমিকের হাটে অন্যদের মতো কাজের খোঁজে এসেছেন এই রাজমিস্ত্রি। সকাল থেকে কাজের অপেক্ষায় থাকলেও ১০টা পর্যন্ত তিনি কোনো কাজ পাননি। ফলে সড়কের পাশে অন্য শ্রমিকদের মতোও অপেক্ষা করছিলেন।
সাধারণ জনগণ নিয়ে সরকারের কোনো চিন্তা নেই বলে অভিযোগ করে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের তো এই সাধারণ জনগণের দিগে কোনো চিন্তা নাই। হেগো চিন্তা অইলো বড় যারা, হেগোরে টাইন্না আরও বড় করো। সব সরকারই এ তো এক। আমাগো চলতে কষ্ট অয়। তা চিন্তা কে করে।’
একসঙ্গে এই শ্রমিক বিক্রির হাটে এসেছেন রাজিয়া বেগম (৫৬) ও আবদুল আজিজ (৭২) দম্পতি। আবদুল আজিজ রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন। রাজিয়া বেগম ঘর পরিষ্কার, মাটি কাটার কাজ করেন। দুজনেই সকালে খাওয়ার জন্য শুঁটকি ভর্তা আর ভাত এনেছেন। রাজধানীর এই বাজারে দীর্ঘদিন কাজের জন্য বিক্রি হয়ে আসছেন তাঁরা। তবে আবদুল আজিজ অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আর তেমন কাজ করতে পারেন না। আগের মতো নিয়মিত কাজ না পাওয়ায় এখন পরিবার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খান তাঁরা।
রাজিয়া বেগম বলেন, ‘এই কাইল কাজ ছিল না, বেলা একটা পর্যন্ত ঘুইরা গেছি। আগের মতো তো আর এহন কাম নাই। তবু কী করমু। আইসা ঘুইরা যাই। যদি কাজ পাই।’








