সিঁড়ির বেশ কিছু ধাপ চুরি হয়ে গেছে। যেসব ধাপ অবশিষ্ট রয়েছে সেখানেও লোহার পাত ও রডে মরিচা ধরেছে। কিছু কিছু অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা কাচের টুকরা। অযত্নে-অবহেলায় থাকতে থাকতে সিঁড়িতে জন্ম নিয়েছে আগাছা। প্রবেশ ফটকেও ঝুলছে তালা।

চট্টগ্রাম নগরের প্রথম চলন্ত সিঁড়িযুক্ত পদচারী–সেতুর (এসকেলেটর ফুটওভারব্রিজ) চিত্র এটি। সাড়ে ছয় বছর আগে প্রায় চার কোটি টাকায় সেতুটি নির্মাণ করেছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। বর্তমানে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে উদ্বোধনের পর প্রায় দুই মাস চালু ছিল চলন্ত সিঁড়িযুক্ত পদচারী–সেতুটি। এরপর অচল অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে একপর্যায়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এখন কার্যত পরিত্যক্ত এক অবকাঠামোয় পরিণত হয়েছে বিপুল অর্থে নির্মিত সেতুটি।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে চলন্ত সিঁড়িযুক্ত পদচারী–সেতুটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকাজ শেষে ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি এটির উদ্বোধন করেন সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এরপর মাত্র দুই মাস চালু ছিল এই চলন্ত পদচারী–সেতু।

চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম ব্যস্ত জাকির হোসেন সড়কের ওয়্যারলেস এলাকায় এই চলন্ত পদচারী–সেতু নির্মাণ করা হয়। এই সড়ক দিয়ে নগরের অভ্যন্তরীণ পরিবহনের পাশাপাশি ঢাকাগামী গাড়িও চলাচল করে। গাড়ির প্রচুর চাপ থাকে সব সময়।

তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য আফছারুল আমীনের ইচ্ছায় এই স্থানে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে জানান সিটি করপোরেশনের ওই সময়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। সেতু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের দুই কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কাউকে দেখা যায়নি। নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের মতে, যে জায়গায় চলন্ত পদচারী–সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল সেটি উপযুক্ত জায়গা ছিল না। ফলে লোকজন সেটি ব্যবহার করেননি।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে সিঁড়িযুক্ত পদচারী–সেতুটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকাজ শেষে ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি এটি উদ্বোধন করেন সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এরপর মাত্র দুই মাস চালু ছিল এটি। চালুর মাস দু-এক মাস পর করোনা মহামারি শুরু হয়। এ কারণে লকডাউনসহ বিধিনিষেধ দেওয়া হলে এটির পরিচালন কার্যক্রম বন্ধ করেছিল সিটি করপোরেশন। পরবর্তী সময়ে মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও চলন্ত পদচারী–সেতু পরিচালনায় বৈদ্যুতিক সংযোগ, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এসব কারণে চালুর পরপরই বন্ধ হয়ে যাওয়া নগরের একমাত্র ও প্রথম চলন্ত পদচারী–সেতুটি আর খোলা হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় চলন্ত সিঁড়িযুক্ত পদচারী সেতুটিতে আগাছা জন্মেছে

চলন্ত পদচারী–সেতুটি বর্তমানে কী অবস্থায় আছে তা নিয়ে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ধারণা কম। তাঁরা খোঁজখবর নেবেন বলেছেন। এদিকে চলন্ত পদচারী–সেতুর সঙ্গে যুক্ত সাধারণ পদচারী–সেতুটি খোলা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় পথচারীরা রাস্তা পারাপারে এটি তেমন ব্যবহার করেন না। লোকজন এই পদচারী–সেতু এড়িয়ে আগের মতোই ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার হন। সেতুর একটি অংশে ভাসমান মানুষের আনাগোনা রয়েছে।

পদচারী–সেতুর নিচে ছয় বছর ধরে রিকশার যন্ত্রাংশ সারানোর কাজ করেন মোহাম্মদ করিম। গত শনিবার বিকেলে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শুরুর দিকে সেতুটি কিছুদিন চলছিল। এরপর বন্ধ হয়ে যায়। পরে আর চালু হয়নি। এভাবে পড়ে থাকতে গত এক-দুই বছর ধরে সেতুর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। সেতুটি কিছু দূরে ওয়্যারলেস মোড়ে করলেও অন্তত চালু থাকত। কিছু মানুষ ব্যবহার করতেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সিটি করপোরেশনের সেতু হলেও এটি কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়ে আছে। আগাছা জন্মেছে, কিছু যন্ত্রপাতিও চুরি হয়ে গেছে। কিন্তু সিটি করপোরেশন থেকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। আর রোগীদের পারাপারের জন্য সেতু নির্মাণ করা হলেও রোগীরা সড়কের ওপর দিয়ে হাসপাতালে আসা-যাওয়া করেন।

এই ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, জাকির হোসেন সড়কে একটি চলন্ত পদচারী–সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিস্তারিত জানা নেই তাঁর। তিনি প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

পরে যোগাযোগ করা হলে প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিস হাসপাতালের রোগীসহ পথচারীদের সহজভাবে পারাপারের জন্য বেশ কয়েক বছর আগে চলন্ত পদচারী–সেতুটি একসময় নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু কেউ এটি ব্যবহার করেন না। সবাই সড়ক দিয়ে পারাপার করেন। সেতুটির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নেবেন বলে জানান তিনি।

নগরবাসী নয়, অন্য কেউ লাভবান হয়েছেন

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নগরে পথচারীদের পারাপারের জন্য পদচারী–সেতু খুব জরুরি দরকার। তবে তা নির্মাণ করতে হবে এমন জায়গায়, যেখানে প্রচুর মানুষের চলাচল রয়েছে। কিন্তু জাকির হোসেন সড়কের যে স্থানে চলন্ত পদচারী–সেতুটি করা হয়েছিল সেটি উপযুক্ত স্থানে করা হয়নি। কেননা সেখানে মানুষের তেমন যাতায়াত নেই। আবার পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার বন্ধে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা বিভাজকও নেই। তাই মানুষ ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন।

সেতুটির কিছু যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। সম্প্রতি তোলা

প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, চলন্ত পদচারী–সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা তদারকির বিষয় আছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তা ঠিকভাবে পালন করা হয়নি। ভুল জায়গায় স্থাপনের কারণে পথচারী বা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই পদচারী–সেতু নিয়ে আগ্রহ ছিল না। তিনি বলেন, এ কারণে চার কোটি টাকা ব্যয় করে সেতু করা হলেও নগরবাসী উপকৃত হননি। তবে এই সেতু নির্মাণ করে নিশ্চয় কেউ না কেউ লাভবান হয়েছেন। জনগণের কথা চিন্তা না করে এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ নষ্ট হয়েছে। দিন শেষে কোনো সুফল আসেনি।