ক্যালেন্ডারের পাতায় ২২ জুলাই একটি সাধারণ দিন। কিন্তু সাভারের মানুষের কাছে দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি রক্ত, আতঙ্ক, শোক আর অমোচনীয় স্মৃতির প্রতীক। ২০২৪ সালের এই দিনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, প্রাণহানি, ভাঙচুর ও আতঙ্কের যে চিত্র তৈরি হয়েছিল, দুই বছর পরও তার ক্ষত শুকায়নি।

কারও কাছে এটি প্রিয়জন হারানোর দিন, কারও কাছে গুলির শব্দে কেঁপে ওঠা এক বিভীষিকাময় দুপুর, আবার কারও কাছে নিজের ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার স্মৃতি। সময় এগিয়েছে, কিন্তু ২২ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনটি সাভারের মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি।

উত্তপ্ত সকাল, রক্তাক্ত বিকেল

২০২৪ সালের ২২ জুলাই সকাল থেকেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং সাভারের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো ছিল চরম উত্তেজনায় টানটান। কারফিউ চলমান থাকলেও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা রাজপথে অবস্থান নেন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থানা বাসস্ট্যান্ড, পাকিজা মোড়, শিমুলতলা, রেডিও কলোনি, বিশমাইল, বাইপাইলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলির শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। মানুষ জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করেন। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ছয়জনের প্রাণহানির খবর আসে। আহত হন আরও অনেকে। নিহতদের স্বজনদের কাছে দিনটি আজও এক গভীর শোকের স্মারক।

আরও পড়ুন

ফিরে দেখা ২০ জুলাই / কারফিউ-সেনা মোতায়েনেও থামেনি সাভারের আন্দোলন

তবে, ২২ জুলাইয়ের ভয়াবহতা কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সন্ধ্যা নামার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়। অনেক পরিবার অভিযোগ করেন, গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কেউ হারান নগদ অর্থ, কেউ মূল্যবান সামগ্রী, আবার কেউ দেখতে পান দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে গেছে। নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত নিজের ঘরও সেদিন অনেকের কাছে অনিরাপদ হয়ে ওঠে।

‘আজও মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙে’

ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম জানান, তাকে না পেয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে হামলা চালানো হয়। এসময় নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয় এবং বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। ওই ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন।

খোরশেদ আলম জানান, ঘটনার মানসিক অভিঘাত এখনও তাদের পরিবার কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার ভাষায়, মাঝরাতে এখনও পরিবারের সদস্যরা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও নিজের স্বজনদের নিরাপত্তাহীনতার সেই অনুভূতি তাকে এখনও কষ্ট দেয়।

এ ধরনের অভিযোগ আরও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের বক্তব্য, সেদিন শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয়নি; মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে যে আস্থা ছিল, সেটিও ভেঙে পড়ে।

আরও পড়ুন

ফিরে দেখা ২০ জুলাই / বাইরে কারফিউ, মেসে মেসে আঁকা হচ্ছিল আন্দোলনের নতুন ছক

স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, সেদিনের দেখা দৃশ্য যেন আজও চোখের সামনে ভাসে। চারদিকে শুধু গুলির শব্দ, ধোঁয়া আর মানুষের আর্তচিৎকার। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি জীবনে কখনো দেখিনি। সেই দিনের আতঙ্ক এখনও ভুলতে পারিনি।

পোশাক শ্রমিক ময়নাল বলেন, সকাল থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। দুপুরের পর মানুষ যে যেদিকে পেরেছে দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজেছে। পরিবার নিয়ে সারাদিন আতঙ্কে কাটিয়েছি। আজও সেই দিনের কথা মনে পড়লে বুক কেঁপে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দা নাসিমা আক্তার বলেন, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে আমরা ভয়ে বসে ছিলাম। বাইরে শুধু বিস্ফোরণের শব্দ আর মানুষের চিৎকার শুনছিলাম। সন্তানদের নিয়ে যে আতঙ্কে সময় পার করেছি, সেই অভিজ্ঞতা কোনো দিন ভুলতে পারব না।

ঝুঁকির মুখে পড়েছিল সাংবাদিকরাও

ঘটনার দিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিকও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যমকর্মী শেখ নয়ন ফয়সাল জানান, সংবাদ সংগ্রহের সময় তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরবর্তীতে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি সাভার ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে তিনি নওগাঁ জেলায় কর্মরত।

এদিকে শুধু ব্যক্তি নয়, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমও ক্ষতির মুখে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। দৈনিক ফুলকি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক নজমুল হুদা শাহীনকে আটক করে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়। স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য, সেই সময় মাঠে কাজ করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

আরও পড়ুন

ফিরে দেখা জুলাই / থমথমে বিশ্ববিদ্যালয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার এক দিন ১৯ জুলাই

সাভারে দৈনিক ফুলকির সম্পাদক নাসমুস সাকিব বলেন, মূলত পত্রিকা অফিসটিতে ২১ জুলাই পুলিশের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয় লুট করা হয় ল্যাপটপ কম্পিউটারসহ নানা যন্ত্রাংশ। ভাঙচুর করা হয় অফিস আসবাব ও সিসিটিভি ক্যামেরা। আর ২২ জুলাই সেই রেশ ছিল টপবগে।

দুই বছর পরও জীবন্ত সেই দিন

২২ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ সাভারের মানুষের জীবনে শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতিই তৈরি করেনি, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়ে গেছে। যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে, তাদের কাছে প্রতিটি জুলাই ফিরে আসে নতুন করে শোকের স্মৃতি নিয়ে। যারা আহত হয়েছেন, তাদের অনেকে এখনও শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন। আবার যাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন সহিংস ঘটনার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষের মনে। কারণ একটি জনপদের মানুষের মধ্যে যখন নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়, তখন সেই ক্ষত পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সাভারের অনেক বাসিন্দার বক্তব্যেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়।

তাদের ভাষায়, গুলির শব্দ হয়ত থেমে গেছে, কিন্তু সেই দিনের ভয় এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।

আরও পড়ুন

ফিরে দেখা ২০ জুলাই / মাত্র আড়াই মাসেই মাকে হারায় শিশু সুয়াইবা

দুই বছর পরও ২২ জুলাইকে ঘিরে আলোচনা হলেই ফিরে আসে রক্তাক্ত সেই দিনের স্মৃতি। কারও মনে পড়ে হারিয়ে যাওয়া স্বজনের মুখ, কারও চোখে ভেসে ওঠে ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া মহাসড়ক, আবার কেউ স্মরণ করেন ভাঙচুরের শিকার নিজের ঘর বা আতঙ্কে কাটানো সেই দীর্ঘ রাত।

ইতিহাসের প্রতিটি জনপদেরই কিছু দিন থাকে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। সাভারের জন্য ২২ জুলাই তেমনই একটি দিন। এই দিনটি শুধু সংঘর্ষের ইতিহাস নয়; এটি শোক, ক্ষতি, প্রতিরোধ এবং বহু মানুষের ব্যক্তিগত বেদনার এক স্থায়ী দলিল। সময় এগিয়ে চললেও সেই দিনের স্মৃতি এখনও সাভারের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছে।

এমএআরএন/কেএইচকে/জেআইএম