চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরে মশা নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ফল পেতে প্রথমবারের মতো বিটিআই (বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) কেনে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল থেকে ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় এই আধুনিক কীটনাশক কেনা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজম বীর প্রতীক।
উপদেষ্টার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কীটনাশক সরবরাহের দরপত্রপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া স্বার্থের সংঘাত বলে মনে করেন সুশাসন নিয়ে কাজ করা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি বলে দাবি করেন সাবেক উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজম। আর সিটি করপোরেশন বলেছে, উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রপ্রক্রিয়ায় যোগ্য হওয়ায় কাজ পেয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে বিটিআই সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হলেও বিষয়টি সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি অভিমতের কারণে।
মশা নিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম দেখার জন্য সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তা। মশা নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই, দেশেই সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে অবস্থান করলে মশা নিধনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব—মেয়রের ফ্লোরিডায় সফর নাকচ করে এই অভিমত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, ফ্লোরিডায় মশকনিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিদর্শনে যাওয়ার প্রস্তাবটি ছিল ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির অর্থায়নে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত বিটিআই গত বছর ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলের মাধ্যমে কিনেছিল সিটি করপোরেশন।
মশা নিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম দেখার জন্য সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তা। মশা নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই, দেশেই সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে অবস্থান করলে মশা নিধনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব—মেয়রের ফ্লোরিডায় সফর নাকচ করে এই অভিমত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
যেভাবে কাজ পেল উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্টে ই-জিপিতে (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেয় চট্টগ্রামের ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল ও ঢাকার মেসার্স আহসানিয়া ইন্টারন্যাশনাল। আহসানিয়া ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা দর দিলেও দরপত্রের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করায় তাদের প্রস্তাবকে ‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণা করা হয়। ফলে মূল্যায়ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি বাদ পড়ে। এরপর শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার দর দেওয়া ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলকে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ২০০ ইউনিট (প্রতি ইউনিট ৫০০ গ্রাম, অর্থাৎ ১ হাজার ১০০ কেজি) বিটিআই সরবরাহ করে।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর এই ওষুধের ব্যবহার শুরু করে সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বিটিআই কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সরবরাহের ক্ষেত্রে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল। তাই বিটিআই কেনার ব্যাপারে তাঁরা খুব সতর্ক ছিলেন। ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল বিটিআই উৎপাদনকারী যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট নিশ্চিত হওয়ার পর সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দরপত্রপ্রক্রিয়াও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।
ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ জানান, প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স তৎকালীন উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজমের নামেই। তবে উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অন্যজনের কাছে হস্তান্তর করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকার সময় ফারুক–ই–আজম বীর প্রতীকের প্রতিষ্ঠানের মশার ওষুধ সরবরাহের দরপত্রে অংশ নেওয়া উচিত হয়নি।
যোগাযোগ করা হলে সাবেক উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজম বীর প্রতীক প্রথম আলোকে বলেন, ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল তাঁর প্রতিষ্ঠান। তবে এর কার্যক্রম দেখাশোনা করেন ব্যবস্থাপকেরা। উপদেষ্টা হওয়ার বেশ কিছু দিন আগে থেকেই পরিচালনাসংক্রান্ত কার্যক্রম তিনি দেখেন না। তিনি বলেন, উপদেষ্টা থাকার সময় যদি তাঁর প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধ সরবরাহ করে, তাহলে তা নিয়মনীতি মেনে করেছে। এতে তিনি স্বার্থের সংঘাত দেখছেন না।
দরপত্রে অংশ নেওয়া উচিত হয়নি
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকার সময় ফারুক–ই–আজম বীর প্রতীকের প্রতিষ্ঠানের মশার ওষুধ সরবরাহের দরপত্রে অংশ নেওয়া উচিত হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি আগে কখনো সিটি করপোরেশনে মশা মারার ওষুধ সরবরাহ করেনি। তাহলে ফারুক–ই–আজম উপদেষ্টা হওয়ার পর কেন ওষুধ সরবরাহ করতে গেলেন? উপদেষ্টা থাকার সময় তাঁর প্রতিষ্ঠান এ কাজ পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি খুবই দুঃখজনক।
২০২৪ সালের শুরুতেও একই পদ্ধতিতে আবার ওষুধ কেনা হয়। সরকারি ক্রয়বিধির ৭৬(ট) ধারা ব্যবহার করে পাঁচ লাখ টাকার সীমার মধ্যে দেখাতে কেনাকাটাকে একাধিক লটে ভাগ করা হয়। অথচ ওই ধারা মূলত জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিত পরিমাণ কেনাকাটার জন্য প্রযোজ্য।
আগে দরপত্র ছাড়াই ওষুধ কেনা হতো
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মশার ওষুধ কেনাকাটায় নিয়মনীতি মানা হতো না। দরপত্র ছাড়াই পছন্দের প্রতিষ্ঠান ওষুধ সরবরাহের কাজ পেত। বিশেষ কৌশলে দরপত্র ছাড়াই বারবার ওষুধ কেনা হয় ওই আমলে।
২০১৯ ও ২০২২ সালে তিন দফায় ১২ হাজার ৭৫০ লিটার মশার ওষুধ কেনা হয় প্রায় ৭৫ লাখ টাকায়। ওষুধ সরবরাহ করে নগর ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) তৎকালীন সহসম্পাদক অরভিন সাকিবের প্রতিষ্ঠান মেসার্স বেঙ্গল মার্ক ইন্টারন্যাশনাল। তখন কোনো উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।
২০২৪ সালের শুরুতেও একই পদ্ধতিতে আবার ওষুধ কেনা হয়। সরকারি ক্রয়বিধির ৭৬(ট) ধারা ব্যবহার করে পাঁচ লাখ টাকার সীমার মধ্যে দেখাতে কেনাকাটাকে একাধিক লটে ভাগ করা হয়। অথচ ওই ধারা মূলত জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিত পরিমাণ কেনাকাটার জন্য প্রযোজ্য।







