চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ডে গলার শ্বাসনালি কাটা অবস্থায় উদ্ধার ও পরে হাসপাতালে মারা যাওয়া শিশু জান্নাতুল নাইমা ওরফে হীরামনি (৭) হত্যা মামলার রায় পিছিয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আদালত মামলার ঘোষণার দিন পিছিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার নির্ধারণ করেছেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস আরার আদালতে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলাটির রায় আজ মঙ্গলবার ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারিত ছিল।

ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর আ ন ম কামরুল হাসনাত চৌধুরী আজ দুপুরে বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই মামলার রায় পিছিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ৭ জুলাই রায়ের তারিখ ঘোষণা করেন আদালত।

গত শনিবার থেকে চট্টগ্রামে থেমে থেমে ভারী ও অতি ভারী বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আজ ভোর থেকেও চট্টগ্রামে ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। সকালে নগরের কাতালগঞ্জ বৌদ্ধ মন্দির মোড় সংলগ্ন সড়ক হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। নগরের মুরাদপুরের শুলকবহর, চান্দগাঁও সিঅ্যান্ডবি ও আগ্রাবাদ এলাকা হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকা দিয়ে চলাচল করতে মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষ বাসার বাইরে বের হচ্ছেন না।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মাহমুদুল আলম জানান, আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৬০ মিলিমিটার।

তিনি আরও জানান, সাগরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের সতর্কতা রয়েছে।

এমন অবস্থায় আজ আদালতে নির্ধারিত দিনে সীতাকুণ্ডে হীরামনি হত্যা মামলাটির রায় ঘোষণার কথা থাকলেও পিছিয়ে যায়। আদালতে সেবা নিতে আসা লোকজনের উপস্থিতও তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।

এর আগে চলতি বছরের ১ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ভেতরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে জান্নাতুল নাইমা হীরামনিকে গলার শ্বাসনালি কাটা অবস্থায় উদ্ধার করে কয়েকজন শ্রমিক। শিশুটিকে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩ মার্চ ভোরে শিশুটির মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দিনই বাবু শেখ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ঘটনার পর সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাটি তিন মাস তদন্ত শেষে ১১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে একমাত্র আসামি করা হয় ৪৫ বছর বয়সী বাবু শেখকে। তাঁর বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানার মধ্য পুলুপাড়া গ্রামে। আদালত ১৮ জুন আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে। ২১ জুন সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর মোট ৬ কার্যদিবসে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ করা হয়।

এর আগে আসামি বাবু শেখ তাঁর অপরাধ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক(এসআই) মো. কামরুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, অভিযোগপত্রে আসামি বাবু শেখের বিরুদ্ধে সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমাকে হীরাকে অপহরণের পর ধর্ষণ চেষ্টা ও হত্যায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন সকালে হীরামনি দাদার বাড়িতে যাওয়ার জন্য কুমিরায় মাস্টারপাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিল। সকাল সাড়ে ৯টায় সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া নিজ বাসার সামনে থেকে জান্নাতুল নাইমা হীরামনিকে চকলেট কিনে দিয়ে বেড়াতে নিয়ে যায় বাবু শেখ। তারা প্রথমে কুমিরা থেকে বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাসস্টেশনে নামে। এরপর হেঁটে একটি পাহাড়ে শিশুটিকে নিয়ে গিয়ে কাপড় খুলে ধর্ষণের চেষ্টা করলে সে চিৎকার করে। তখন বাবু শেখ কাছে থাকা চাকু দিয়ে শিশুটির শ্বাসনালি কেটে দেয়। পরে শিশুটি মারা গেছে ভেবে ফেলে চলে যায়।

জানা গেছে, শিশু হীরামনির বাবা মো. মনিরুল ইসলাম টমটম চালক এবং মা গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে হীরামনি ছিল মেজো। অন্যদিকে আসামি বাবু শেখ পাশাপাশি গ্রামের প্রতিবেশী।