টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রাম জেলায় ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার রাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্যের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সওজের আওতাধীন ২০টি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে এলজিইডির আওতাধীন জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০। পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচজন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা। এ দুই উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।
শুক্রবার সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাকবলিত ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকা পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাংবাদিকদের বলেন, টানা প্রায় পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, হাটহাজারী, ফটিকছড়িসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের সব কটিই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শুধু এ উপজেলাতেই চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বন্যা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং প্রতিটি উপজেলা প্রশাসনে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জানান, বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৭০০ টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০টি শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং ৯ হাজার ৮০০টি রান্না করা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের কাছে জরুরি ত্রাণ হিসেবে আরও ৪০০ টন চাল ও ১৭ লাখ টাকা মজুত রয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলার জন্য ইতিমধ্যে ২৫ টন চাল ও ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বন্যাকবলিত সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে। সন্দ্বীপে সহায়তা করছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। পাশাপাশি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকেরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি ছুটির দিনেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাঠে থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে গত শনিবার থেকে চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টিপাত শুরু হয়। বুধবার জেলার ১৫টি উপজেলার মধ্যে ১৩টি উপজেলা প্লাবিত হয়। এতে সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকের ফসল ও মাছচাষিদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও শুক্রবার পর্যন্ত সাতকানিয়া, বাঁশখালীসহ একাধিক উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দী ছিলেন এবং জেলার বিভিন্ন সড়কে যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।








