চাঁদাবাজি, বাড়ি দখলচেষ্টা, জুলাই আন্দোলনের শহীদের পিতাকে প্রাণনাশের হুমকি, অবৈধভাবে বালু বিক্রি, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে অর্থ দাবির অভিযোগের পর ফের বিতর্কের মুখে পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজা। এবার তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলার আসামি ও ধামরাই উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ চৌধুরীকে ক্যাম্পাসের দুই নারী শিক্ষার্থীর গোপনে ছবি তোলার অভিযোগের পর তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার তদবির করার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেলিম রেজার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন দেবাশীষ চৌধুরী। এসময় বটতলা এলাকায় অবস্থানকালে তিনি দুই নারী শিক্ষার্থীর অজান্তে তাদের ছবি তোলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে যান। সেখানে তার কাছ থেকে দুটি বিয়ারের ক্যান উদ্ধার করা হয়, যা পরে প্রশাসনের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়। পরে তার থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নিরাপত্তা অফিসে দেওয়া লিখিত স্বীকারোক্তিতে দেবাশীষ চৌধুরী বলেন, ‘আমি বটতলায় খাওয়াদাওয়া করেছি। পরে কিছু মেয়ের গোপনে ছবি তুলেছি। এটি আমার ঠিক হয়নি। আমি সবার কাছে ক্ষমা চাইছি। ভবিষ্যতে আর কখনো অনুমতি ছাড়া কারো ছবি তুলবো না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবো না।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অভিযুক্তকে আইনগত ব্যবস্থার আওতায় না এনে লিখিত মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেলিম রেজার তদবির ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনে সেলিম রেজা বলেন ‘দেবাশীষ চৌধুরী আমার বড় ভাই এবং এই রকম কিছু করার কথা না’।
তিনি আরও বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় সেলিম রেজা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক পরিচয় বারবার ব্যবহার করে প্রশাসনক ঘটনা দ্রুত শেষ করতে বলেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। অভিযোগের পর তাকে নিরাপত্তা অফিসে আনা হয়। তিনি লিখিতভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন না বলে মুচলেকা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত গাড়িও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবে না। এসব শর্তে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত দেবাশীষ চৌধুরী ২০১৮ সালে ধামরাইয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ইয়াবা ট্যাবলেট খাইয়ে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি।
বিষয়টি জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, ঘটনার পুনর্তদন্ত এবং পুরো ঘটনায় জড়িতদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, একই ধরনের ঘটনায় অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা ও বহিষ্কারের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিলেও এবার কেবল মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ায় প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জাবিতে বহিরাগত কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টা, চুরি ও অন্যান্য অপরাধের পর, একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে বহিরাগতকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরও আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এদিকে এটি জাবি ছাত্রদল নেতা সেলিম রেজাকে ঘিরে প্রথম বিতর্ক নয়। গত কয়েক মাসে তার বিরুদ্ধে সাবেক ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে একটি দোকান দখল, জুলাই আন্দোলনের এক শহীদের পিতাকে হেনস্তা ও প্রাণনাশের হুমকি, বাড়ি দখলচেষ্টা, অবৈধভাবে বালু বিক্রি, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের অধিকাংশ ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ হলেও ছাত্রদলের নিজ দলের নেতাকর্মীরাও রয়েছে। এসব অভিযোগের পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ থেকেও তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে চলাচলকারী ইলেকট্রিক কার্ট মালিক ইমন হাসান অভিযোগ করেন, ঋণসংক্রান্ত বিরোধের সুযোগ নিয়ে সেলিম রেজা নিজেকে ঋণদাতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তার কাছে অর্থ দাবি করেন। পরে কয়েকটি কার্ট আটকে রেখে ১৬ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে সেই দাবি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা দিতে চাপ দেওয়া হয়। এসময় তার কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর, হুমকি এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও ওঠে সেলিম রেজার অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ ঘটনার বিষয়ে সেলিম রেজা গণমাধ্যমে বলেন, ‘উনি আমার অতিথি হিসেবে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। ছবিগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তোলা হয়নি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বোন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে তাদের ছবিও উঠে যায়। বিষয়টি জানার পর আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ওই দুই শিক্ষার্থীর পক্ষ হয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। কোনো ধরনের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে বা কাউকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে আমি সেখানে যাইনি। এ ঘটনায় আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
এ বিষয়ে জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, বটতলায় বহিরাগত কর্তৃক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার ঘটনাটি সত্যিই নিন্দনীয় এবং প্রতিবাদযোগ্য। একই সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো নেতা বা কর্মী যদি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে থাকেন, সেটিও সমানভাবে নিন্দনীয়। আমরা বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানাব। কেন্দ্রীয় কমিটি যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
মো. রকিব হাসান প্রান্ত/এফএ/জেআইএম






