মৃত্যু তখনো মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। চারপাশে ধসে পড়া কংক্রিটের স্তূপ। বুকের ভেতর দুই ছোট ছেলেকে আঁকড়ে ধরে অনিশ্চিত অপেক্ষায় ছিলেন এক বাবা। ওপরে চলছে প্রাণপণ উদ্ধার অভিযান, আর ধ্বংসস্তূপের নিচে ক্ষীণ হয়ে আসছে বেঁচে ফেরার আশা। ঠিক সেই মুহূর্তে হাল ছাড়েননি বড় ছেলে জেসুস গার্সিয়া। নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লড়াই করে অবশেষে বাবা ও দুই ভাইকে জীবিত ফিরিয়ে আনেন তিনি। গত ২৪ জুন ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর বাবা ও দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধার করেন জেসুস গার্সিয়া। রোববার আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।

ভেনিজুয়েলার লা গুয়াইরার উপকূলীয় এলাকা কারাবালেদায় একটি বহুতল ভবনের দ্বিতীয়তলায় স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন হোসে গার্সিয়া। ভূমিকম্পের প্রচণ্ড কম্পনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভবনটি ধসে পড়ে এবং পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। হোসের ভাষ্যানুযায়ী, ধসের পর তিনি বুঝতে পারেন যে, ভবনের নিচের অংশে আটকা পড়েছেন। তার সঙ্গে ছিল ৭ বছর বয়সি দিয়েগো ও ১২ বছর বয়সি সান্তিয়াগো। তিনি বলেন, জীবনে এত ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে কখনো হননি। এদিকে বড় ছেলে জেসুস গার্সিয়া ভূমিকম্পের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। একসময় ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত থাকলেও তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার এক সাবেক সহকর্মী সংরক্ষণ করে রাখা হেলমেট ও জ্যাকেট এনে দেন, যা উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথমদিকে জেসুস জানতেন না পরিবারের কেউ জীবিত আছেন কি না। পরে এক সহকর্মী তাকে জানান, তার বাবা ও দুই ভাই এখনো ধ্বংসস্তূপর নিচে জীবিত রয়েছেন। কিছুক্ষণ পর বাবার কণ্ঠও শুনতে পান তিনি। জেসুস বাবাকে আশ্বস্ত করে বলেন, তিনি তাদের উদ্ধার না করে সেখান থেকে যাবেন না। তবে রাতের অন্ধকার ও ভারী কংক্রিটের কারণে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হয়নি। পরদিন উদ্ধার সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর অভিযান নতুন গতি পায়। পুলিশের উদ্ধারকারী ইউনিট, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভূমিকম্পের প্রায় ২০ ঘণ্টা পর হোসে গার্সিয়া ও তার দুই সন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পরিবারকে নিরাপদে বের করে আনার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেসুস। তিনি ছোট দুই ভাইকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার কথা জানান এবং পরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। হোসে বলেন, এই অভিজ্ঞতা তার জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়া তার এবং তার সন্তানদের জন্য এক বিরল আশীর্বাদ। তবে আনন্দের মাঝেও রয়েছে গভীর বেদনা। হোসের স্ত্রী এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ রয়েছেন। সরকারি তথ্যানুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। শত শত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। স্বাধীন বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। বর্তমানে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। হোসে গার্সিয়াও প্রতিদিন ধসে পড়া ভবনের পাশে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তিনি নতুন করে জীবন শুরু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।