মাঠে তাঁর ড্রিবলিং দেখে মনে হয়, বল যেন পায়ের সঙ্গে আটকে আছে। লিওনেল মেসির এই অসাধারণ দক্ষতার পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তাঁর অনন্য শারীরিক গঠনও।
চারপাশে ডিফেন্ডার, সামনে জায়গা নেই। তবু মুহূর্তের মধ্যে ড্রিবল করে সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান লিওনেল মেসি। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি অতি পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু এই জাদুর পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, সাহায্য করে তাঁর দৈহিক গঠনও।

মেসির উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। তাঁর শরীরের তুলনায় পা তুলনামূলক ছোট। তাঁর শরীরের গঠন কমপ্যাক্ট। শৈশবের গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি তাঁর উচ্চতায় প্রভাব ফেলেছে। যদিও পা ছোট হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে সেটিকে দেখানোর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে খাটো উচ্চতা আর শারীরিক গঠনের কারণে ছোটবেলা থেকেই বারবার অবহেলা, সংশয় আর কটূক্তির মুখে পড়তে হয়েছে মেসিকে।
মেসির ছোটখাট গড়নের জন্য তাঁকে ফুটবল খেলার অনপযুক্ত মনে করা হতো। অথচ সময়ের সঙ্গে সেই গঠনই হয়ে উঠেছে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। দেহের তুলনায় পা ছোট হওয়ায় তাঁর দেহের ভরকেন্দ্রকে (সেন্টার অব গ্রাভিটি) মাটির আরও কাছাকাছি রাখে।

পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়
ভরকেন্দ্র যত নিচে থাকে, শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখা তত সহজ হয়। তাই প্রচণ্ড গতিতেও মেসি সহজে নিয়ন্ত্রণ হারান না। প্রতিপক্ষের ধাক্কা সামলে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে, কয়েকজন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় মেসি বারবার ছোট ছোট স্পর্শে বলের দিক বদল করেন। ডিফেন্ডাররা তাঁর পরের পদক্ষেপ বোঝার আগেই তিনি নতুন কোণ তৈরি করে গোলপোস্টে পৌঁছে যান।

তবে তুলনামূলক ছোট পা তাঁকে আরও একটি বায়োমেকানিক্যাল সুবিধা দেয়। পায়ের দোলনের ব্যাসার্ধ কম হওয়ায় তিনি খুব দ্রুত ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে পারেন। একই সঙ্গে শরীর ঘোরাতেও কম সময় লাগে। ফলে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে দিক বদলে প্রতিপক্ষকে ভুল পথে পাঠিয়ে দিতে পারেন। আর বলকে পৌঁছে দিতে পারেন জালে।
তবে ছোট পা বা নিচু ভরকেন্দ্রই মেসির সাফল্যের পুরো ক্রেডিট নিতে পারে না। অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, সেকেন্ডে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, পরিস্থিতি বুঝতে পারার দক্ষতা আর হাজার হাজার ঘণ্টার অনুশীলনের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে তাঁর কিংবদন্তি ড্রিবলিং। বিজ্ঞান তাঁকে কিছু বাড়তি সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু সেই সুবিধাকে বিশ্বসেরার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন মেসি নিজেই।

সুইডিশ গবেষণা বলছে, মেসির সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাঁর মস্তিষ্ক
ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছেন মেসি। গ্রোথ হরমোনের ঘাটতির কারণে তিনি জানতেন, অন্যদের মতো লম্বা হবেন না। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাকে দুর্বলতা না বানিয়ে আরও বেশি অনুশীলন করেছেন। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে আজকের কিংবদন্তি ড্রিবলারে পরিণত করেছে।

মেসির ড্রিবলিংয়ের রহস্য খুঁজতে করা একটি সুইডিশ গবেষণায় বলা হয়েছে, তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু পায়ের দক্ষতা নয়, মস্তিষ্কের দ্রুত কাজ করার ক্ষমতাও। মাঠের পরিস্থিতি তিনি প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক দ্রুত বুঝতে পারেন।

কে কোথায় আছে, কোথায় ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে, কখন পাস দেবেন আর কখন ড্রিবল করবেন—এসব সিদ্ধান্ত তিনি মুহূর্তের মধ্যেই নিয়ে ফেলেন। তাই প্রতিপক্ষ যখন তাঁর পরের পদক্ষেপ বুঝতে চেষ্টা করে, ততক্ষণে মেসি এক ধাপ এগিয়ে যান।







