ফুটবল-রূপকথা লিখল সিন্ধুতে বিন্দুর টিপের মতো একটি ছোট্ট দ্বীপদেশ। বিশাল পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট সন্তান। বিশ্ব যাদের চিনেছে এই বিশ্বকাপে কোথায় কোন দূরে এক টুকরো ভূমি-কেপ ভার্দে। একরত্তি দেশ। বিশ্বকাপ ফুটবলের ৯৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট। কীভাবে রূপকথার গল্প লিখল মাত্র এক লাখ ৫৮ হাজার মানুষের দেশ? দ্বীপবাসী দুচোখে স্বপ্নের কাজল মেখে এমন এক মহাকাব্য রচনা করল, যার পাতায় পাতায় বিস্ময়! এও কি সম্ভব! ১০০ কোটি লোকের দেশের কাছে বিশ্বকাপ ভিনগ্রহ। আর কিনা দেড় লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার দেশ বিশ্বকাপে। কীভাবে?

স্বপ্ন সত্যি হলো। গোটা দেশ আনন্দে নাচল। কেপ ভার্দে বিশ্বকে বার্তা দিল-স্বপ্ন দ্যাখো। স্বপ্ন তাড়া করো। একদিন সত্যি হবে। বিশ্ব চমকে যাবে। বিশ্বকে চমকে দাও। চমকের কেন্দ্রে ৪০-এর গোলপ্রহরী। ভোজিনিয়া তার নাম। আটলান্টিক মহাসাগরে ১০টি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা কেপ ভার্দের এই মুহূর্তে সবচেয়ে পরিচিত মুখ। হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয়ও। ফুটবলবিশ্ব এখন এক নামে তাকে চেনে। শনিবার বাংলাদেশে যখন নেশাতুর ভোর সকালকে আলিঙ্গনের আহ্বান জানাবে, যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে তখন ভোজিনিয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তার সামনে এক মনুমেন্ট-লিওনেল মেসি। বয়সে দুজনের মধ্যে পার্থক্য এক বছরের। কিন্তু ফুটবল অভিধানে দুজন-ডেভিড অ্যান্ড গোলিয়াথ কিংবা গালিভার ও লিলিপুট। সেখানেই থামবে কেপ ভার্দের স্বপ্নযাত্রা-একথা বলার মধ্যে কত শতাংশ ঝুঁকি আছে? ফুটবলে যদিও মস্তিষ্ক ও মনের নিরন্তর এবং কখনো কখনো অবান্তর লড়াই চলে, তবু সম্ভাবনা কণামাত্র উঁকি দিলেও কোনো ঝুঁকি নেই এটা বলতে যে, ছোট্ট দ্বীপদেশের সুন্দর সফরের এখানেই সমাপ্তি।

সুন্দর ও অপ্রত্যাশিত সফর। বিশ্বকাপে তাদের খেলাটাই তো এক মহা-আশ্চর্য! তারপর গ্রুপপর্বে দুই সাবেক চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবকে রুখে দিয়ে শেষ বত্রিশের ট্রেন ধরা-এ তো আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপকেও হার মানায়। স্বপ্নের দৌড় কি কখনো ম্যারাথন হয়। হয়তো হয়। তাই বলে মেসি-ভোজিনিয়া দ্বৈরথও? স্পেন ম্যাচে সাতটি স্মরণীয় সেভের পর কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী পাঁচ লাখ থেকে এক লাফে গিয়ে ঠেকেছে ১৭.৪ মিলিয়নে। ভোজিনিয়া বলেছেন, ‘আমাদের দেশটা অতিক্ষুদ্র। কিন্তু আমাদের হৃদয় অনেক বড়। আমরা যোদ্ধা।’

ঠিক আছে, যোদ্ধা। কিন্তু ৯০ মিনিটের যুদ্ধে ভোজিনিয়াদের সামলাতে হবে এক জাদুকরকে। ফুটবল যার জাদুতে মোহাবিষ্ট। শৈশবে দাদি যাকে সমুদ্র দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ওই দ্যাখো ঢেউয়ের দাপট। ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ো।’

ভোজিনিয়াদের সামনে এবার খোদ আটলান্টিক মহাসাগর।