রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়েছে। রোগীদের হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স ছাড়াই বহিরাগত দালালচক্রের নিয়োজিত লোকজন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। যত্রতন্ত্র নোংরা আবর্জনায় একাকার নিচতলা থেকে হাসপাতালের পঞ্চমতলা পর্যন্ত কুকুরের অবাধ বিচরণ। হাসপাতালের একাধিক ওয়ার্ডে ঘুরে এ দৃশ্য চোখে পড়েছে।

সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে শুক্রবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে এক রোগী দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন। চিকিৎসকের চেয়ারে বসে আছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক। দালালচক্রের নিয়োজিত দুজন বহিরাগত পরিচ্ছন্নতাকর্মী তার শরীরে ড্রেসিং করছেন। সেলাইয়ের সুতা (ক্যাটগাট) ও ওষুধ লিখে দেওয়া হয়েছে রোগীর স্বজনকে। এ দৃশ্য অনুসরণ করে দেখা গেছে, রোগীর স্বজন ওষুধ কিনে আনার পর সেগুলো রেখে তার পরিবর্তে হাসপাতাল থেকে সরবরাহকৃত ওষুধ ও সেলাইয়ের সুতা ব্যবহার করে রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর রোগীর কেনা ওষুধ নির্দিষ্ট ওষুধের দোকানে ফিরিয়ে দিয়ে সেখান থেকে টাকা ফেরত নিয়ে আসে ওই দালালচক্রের সদস্য। আবার রোগীর চিকিৎসার নামে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিদিন এভাবে রোগী চিকিৎসার নামে জন্য রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে-আবার রোগীর কেনা ওষুধ বাইরে বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। এর সঙ্গে জড়িত ওয়ার্ড মাস্টার, নার্স ও বহিরাগত দালালচক্র। দুর্ঘটনায় বা কোনো কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগী হাসপাতালে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ দালালচক্রের সদস্যরা রোগীকে হাসপাতালের ট্রলিতে তুলে নেয়। এজন্য ট্রলি ভাড়া দিতে হয় ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। এরপর দালালচক্রের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকের সখ্য থাকায় রোগী চিকিৎসা শুরুর আগেই ১৫শ থেকে ৩ হাজার টাকার ওষুধের প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিয়ে থাকেন তারা।

সেখানে সেলাইয়ের সুতাসহ বিভিন্ন ওষুধ লিখে দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। দালালচক্র সেই রোগীর স্বজনদের নির্দিষ্ট দোকানে ওষুধ কিনিয়ে এনে তা ব্যবহার না করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দোকানে বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নেয়।

পঞ্চগড় বোদা উপজেলার শাহাজান নামের এক রোগীর সূত্র ধরে এ দালালচক্রকে ধরতে এই প্রতিবেদক ভুক্তভোগীকে সঙ্গে নিয়ে দালালচক্রের মাধ্যমে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে যান ধাপ এলাকার মৌ মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারিক্যাল ওষুধের দোকানে। দোকান থেকে ১৮৬৮ টাকার ওষুধ কিনে রংপুর মেডিকেলের সার্জারি বিভাগের ৪ তলার ১৫নং ওয়ার্ডে রোগীকে নিয়ে আসেন। সেখানে বাইরে থেকে রোগীর আনা ওষুধ জমা রেখে হাসপাতালের ওষুধ দিয়েই চিকিৎসা দেওয়া হয়। আরও দেখা যায় বহিরাগত দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রোগীর ড্রেসিংয়ের কাজ করছেন। এ সময় রোগীর স্বজনের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা বাড়তি দাবি করেন ওই বহিরাগত পরিচ্ছন্নতাকর্মী। রোগীর স্বজন টাকা না দিতে পারায় রোগীকে ‘লোকাল এনেস্থেসিয়া ছাড়াই’ রোগীর ক্ষত স্থানের সেলাইয়ের কাজ করেন। পরে দালালচক্র রোগীর দেওয়া সেই ওষুধ ১৬৫০ টাকা নিয়ে মৌ মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারিক্যাল ওষুধের দোকানে ফিরিয়ে দেয়।

ওয়ার্ড মাস্টার হাসান মিয়া বলেন, সব সমস্যা আমরা দেখতে পারি না। তবে প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকেন তারা এসব দেখেন। তাদের সঙ্গে কথা বললে আপনি উত্তর পাবেন। এ নিয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, আমরা সবসময় দালালচক্রের নজরদারি করতে পারি না। হাসপাতালে কুকুরের অবাধ বিচরণ নিয়ে তিনি বলেন, দুই শিফটে আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। তবুও বিভিন্ন ওয়ার্ডে কুকুর ঘুরে বেড়ানোটা খুবই উদ্বেগজনক। এসব বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।