মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া-চীন সফর, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাফসান গালিব সহুল আহমদ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর করলেন। মালয়েশিয়া হয়ে তিনি চীনে গিয়েছেন। প্রথম দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া সফরকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের পর প্রথম বিদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কোনো নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ভারত বা চীন কোন দেশকে প্রথম সফরের জন্য বেছে নেন, তা দিয়ে জনপরিসরে ধারণা তৈরি হয়, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কোন নির্দিষ্ট বলয়মুখী হবে। এটা বিবেচনা করলে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য প্রথম দেশ হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়াটা অপেক্ষাকৃতভাবে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘স্মার্ট ডিপ্লোমেটিক মুভ’ বলে আমি মনে করি।

মালয়েশিয়ার একটি ভিন্ন বৈশ্বিক ইমেজ রয়েছে যে তারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জোটনিরপেক্ষ ভাব বজায় রেখে চলছে। উপরন্তু মালয়েশিয়া আসিয়ানের প্রভাবশালী এবং ওআইসির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত—এই তিন শক্তির একটি ত্রিমুখী টানাপোড়েন আছে। মালয়েশিয়া এই প্রতিটি শক্তির সঙ্গেই একটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম। অর্থনৈতিকভাবেও তারা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মোট রেমিট্যান্সের ৬ থেকে ৯ শতাংশ আসে মালয়েশিয়া থেকে। ফলে এই সফরের মাধ্যমে নতুন সরকার এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে বাংলাদেশ আসলে তার নিজস্ব স্বাধীন পথেই চলছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতেও মালয়েশিয়া গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথ ব্যবহার করে যে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়ে, তাদের অন্যতম বৃহত্তম গন্তব্য মালয়েশিয়া। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান নেয়। ফলে প্রথম সফর হিসেবে সেখানে যাওয়ার মানে হলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়াকে কূটনৈতিকভাবে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া।

মালয়েশিয়ার পর চীন সফরেও লালগালিচা সংবর্ধনা পেয়েছেন তারেক রহমান। অনেকগুলো সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। চীন সফরকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: প্রথম বিষয় হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে যেমন আওয়ামী লীগের সম্পর্ক, একটা সময় চীনের সঙ্গেও বিএনপির সম্পর্কটা ওই রকমই ছিল। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, চীনের সঙ্গে তাদের একটা দারুণ সুসম্পর্ক আর আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছিল।

তবে সেই সুসম্পর্কের ব্যাঘাতটা ঘটল ২০০১ সালের পরে অর্থাৎ ২০০৪ সালে ঢাকায় তাইওয়ানের তাইপে ইকোনমিক অ্যান্ড কালচারাল অফিস খোলার মধ্য দিয়ে। তাইওয়ান নিয়ে চীনের স্পর্শকাতরতা যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই চীন এটাকে ভালোভাবে নেয়নি। তাই তাইওয়ান ইস্যুতে বিএনপি-চীনের ঐতিহ্যগত আস্থার সম্পর্কে বড় ধরনের চিড় ধরে।

পরবর্তী সময়ে যখন নতুন সরকার এল, তখন চীনের আচরণেও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা প্রকাশের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটা আর থাকল না ২০০৮–এর নির্বাচনের পরে। এতে পুরোমাত্রায় আওয়ামী লীগের দিকেই হেলে যাওয়াটা সহজ হয়ে গেল।

২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই তৎকালীন চীনা রাষ্ট্রদূত গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসেন। এমনকি ২০২৪ সালে নির্বাচনের পরের দিনও একই দৃশ্য দেখা যায়। কে ক্ষমতায় আছে, কার মতাদর্শ কী—সেটার চেয়ে চীনের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখলে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের সুরক্ষাটা নিশ্চিত হবে।

এখন চীন মনে করছে, বিএনপির সঙ্গে মাঝখানে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সেটা ঘুচিয়ে নেওয়াসহ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের একটা নতুন সুযোগ তাদের সামনে এসেছে। ঠিক একইভাবে বিএনপির জন্যও এই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে চীনের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ তৈরির একটা বড় সম্ভাবনার দেখা মিলেছে।

বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনৈতিক। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) একটা বিরাট অংশ বরাদ্দ থাকে যোগাযোগব্যবস্থাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিকভাবে চীনের চেয়ে বড় উৎস কিন্তু এই মুহূর্তে আর কেউ নেই। বিশেষ করে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের আওতায় তারা নানা অবকাঠামো নির্মাণে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে একধরনের সড়ক ও সমুদ্রপথে বিশ্বব্যাপী একটি যোগাযোগ ও বাণিজ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। আর এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তারা বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।

একই সঙ্গে আপনি যদি বৈশ্বিক রাজনীতির দিকে তাকান, সেখানেও কিন্তু একটা বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। ইরান যুদ্ধ বা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে উত্তেজনা এবং শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার যে চেষ্টা, তা থেকে এটা নিশ্চিত যে এখনকার যুক্তরাষ্ট্র আর আগের দাপুটে অবস্থায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিন্তু এখন অনেকটাই ক্রমহ্রাসমান।

রাজনীতিতে তো দিন শেষে একটা বড় বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা এখন যেকোনো সময়ে চেয়ে অনেক কম। যেমন: বিশ্বজুড়ে ‘ইউএসএইড’ তাদের কাজ গুটিয়ে নিল। ফলে এই মুহূর্তের বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতায় এখন অনেক রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রকে তোয়াক্কা না করার একটা সাহস রাখছে।

বাংলাদেশের জন্যও এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা সরিয়ে রেখেও যদি চীনের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুনিশ্চিত করা যায়, সেটাই বাংলাদেশ করতে চাইবে। আবার চীনের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকম। উপরন্তু চীন ২০১৬ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে এই সময়ে এসে দুই পক্ষের স্বার্থেরই একটা চমৎকার সম্মিলন ঘটেছে।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

চীনের সঙ্গে অনেকগুলো সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্পষ্ট কোনো চুক্তি হয়নি বা সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: ২০১৬ সালে সি চিন পিং যখন ঢাকা এসেছিলেন, তখন কিন্তু ২০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহযোগিতার একটা বড় কমিটমেন্ট হয়েছিল এবং আমরা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’ যোগ দিয়েছিলাম। সেই ধারাবাহিকতাতেই পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেলসেতু কিংবা কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রজেক্টগুলো চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে।

আসলে বর্তমান ভূরাজনীতিতে, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকার সঙ্গে দ্বৈরথ এবং মালাক্কা প্রণালির বিকল্প হিসেবে মোংলা-চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বঙ্গোপসাগর চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন চায় তাদের ইউনান প্রদেশকে আমাদের এই বন্দরগুলোর সঙ্গে কানেক্ট করতে। সমঝোতা স্মারক হয়তো আইনিভাবে বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু এটা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির একটা শক্তিশালী প্রকাশ।

চীন–ভারত: বড় শক্তির ছায়ায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজের ছায়া অক্ষুন্ন রাখবে

বাংলাদেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি সই করল, যা ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আবার ঠিক এর পরপরই চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই দুই অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: এখন আমরা অনেকেই ‘মাল্টি-ভেক্টর ডিপ্লোমেসি’ বা কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে বন্দী হয়ে না থেকে একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত সেই সব শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিক কূটনীতিতে যুক্ত হওয়া। যেখানে সবার সঙ্গে একটা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার চেষ্টা থাকে। কিন্তু এখানে গভীর কিছু হিসাব-নিকাশ আছে। এই কূটনীতির ঝুঁকি হলো সফল হতে না পারলে সেই সব প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ‘শক্তি পরীক্ষার থিয়েটার’-এ পরিণত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি যদি আমরা দেখি, তারা এখন তীব্রভাবে ‘ইকোনমিক ন্যাশনালিজম’ বা অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছে, যেটাকে তারা বলছে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। বিশ্বমোড়ল হিসেবে অন্য দেশকে নিজের বলয়ে রাখার জন্য যে পরিমাণ আর্থিক সুবিধা বা ‘পাবলিক গুডস’ দেওয়া দরকার, আমেরিকা এখন আর সেই অর্থনৈতিক অবস্থায় নেই।

আর এই অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ তাদের উৎসাহিত করেছে কোনো মিষ্টি প্রলেপ ছাড়াই একদম নগ্নভাবে তাদের আর্থিক স্বার্থ আদায় এবং তা সুরক্ষায় বাংলাদেশের সঙ্গে এমন একটা অসম ও বিতর্কিত চুক্তি করতে। তারা এমন একটা সরকারের শেষ মুহূর্তকে বেছে নিয়েছিল, যাদের জনগণের ম্যান্ডেটের কোনো তোয়াক্কা করতে হয়নি। এখন বর্তমান সরকারও যদি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলে, তাহলে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন একটা অসম চুক্তিতে আটকে থাকার তো কোনো মানে হয় না। এটাকে পুনর্বিবেচনা করার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে এই দর-কষাকষিটা বাংলাদেশ কীভাবে করবে? এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ‘বার্গেনিং টুল’ হচ্ছে চীন। মালয়েশিয়া একটা উদাহরণ হতে পারে। তারা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে শক্তিশালী বন্ধন রাখে, আবার অর্থনীতির ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক বজায় রাখে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা চাপ বা অর্থনৈতিক অসমতাকে মোকাবিলা করতে হলে চীনকে একটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আসলে এই মুহূর্তে আর কোনো বিকল্প নেই।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের এই টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলী অবস্থানের কথা বললেন, এটা কি একইভাবে ভারতের সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নতুন কোনো বাড়তি সুবিধা দেবে বা দিচ্ছে?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: ভারতের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার এই সমীকরণটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। আঞ্চলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত হচ্ছে চীনের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। এই কারণে চীনকে মোকাবিলা করতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্বার্থে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় কৌশলগত জোট আছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যেও একধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একটা সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ভারতের ওপর ভরসা করত। সেই জায়গায় এখন একটা বড় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয়। এই পরিবর্তনটাই বাংলাদেশের জন্য একটা সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

এই সুযোগ আমরা কীভাবে কাজে লাগাব, তা নির্ভর করছে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কতটা পেশাদারত্বের প্রমাণ দিতে পারছে তার ওপর। আগে যেখানে প্রায় সব বড় সিদ্ধান্ত এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে আসত, সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পেশাদারত্ব চর্চার ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক: উদীয়মান প্রাচ্যের জোয়ারে নতুন যাত্রা

এই সফরে দেখা গেল তিস্তা মহাপ্রকল্পের ব্যাপারে চীনের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। ওদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় ভারতের রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন ঘটেছে। ক্রমাগত পুশ ইন করা হচ্ছে। এই পুরো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: ভারতের সঙ্গে বিএনপির টানাপোড়েন সব সময়ই ছিল। ভারতের সঙ্গে তাদের কখনো ওই আস্থার সম্পর্কটা গড়ে ওঠেনি। তবে এখনকার নতুন অভিজ্ঞতাটা হলো, পশ্চিমবঙ্গে একটা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে বিজেপির ‘পরিচয়বাদী রাজনীতি’র মূল ভিত্তিই হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম কার্ড। তাদের কাছে বাংলাদেশ মানেই একটা মুসলিম জনগোষ্ঠীর রিপ্রেজেন্টেশন। তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ের জন্যই এই পরিচয়বাদী রাজনীতিটা করা খুব দরকার।

এখন এই ধরনের উগ্রপন্থী শক্তি যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের ভোটাররা জানেন যে এই দল নিজের দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে কোনো ছাড় দেবে না। ফলে ভোটারদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়ার ভয় থাকে না। দ্বিতীয়ত, তারা আদৌ ছাড় দেবে কি না, তা নির্ভর করে তারা এই হিন্দু-মুসলমানের পরিচয়ের রাজনীতির বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থকে ভিন্নভাবে দেখতে পারছে কি না, তার ওপর।

তবে তাদের জন্য এই পরিচয়ের রাজনীতির বাইরে বের হওয়া খুবই কঠিন। কাজেই এই টানাপোড়েনটা দুই দেশের কূটনীতিতে শিগগির কেটে যাবে, তার সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ভারত সফরে গিয়ে যে তিক্ত এবং অকূটনৈতিক আচরণের শিকার হয়েছেন, তা ভালো কিছু নির্দেশ করে না।

যুক্তরাষ্ট্র–চীন: দুই পরাশক্তির বিশ্বে বাংলাদেশ কী করবে

এই সূত্র ধরেই প্রসঙ্গটি তুলে ধরছি, বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার কোনো পেশাদার কূটনীতিক নন। তিনি একজন রাজনীতিবিদ। এই ধরনের পদে কোনো রাজনীতিবিদ নিয়োগ দেওয়া খুব স্বাভাবিকও নয়। এখানে কি আপনি বিশেষ কোনো সংকেত দেখতে পাচ্ছেন?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: অবশ্যই। এটা দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, বিজেপি মূলত তাদের রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে এবং তাদের সেই ‘পরিচয়বাদী রাজনীতি’কে সমুন্নত রাখতেই একজন রাজনীতিবিদকে পাঠিয়েছে। ওনার বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়াটাও দেখেন, উনি স্থলপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এটা একধরনের জনতুষ্টিবাদেরই অংশ। ওনার কর্মকাণ্ডে এই জনতুষ্টিবাদ এবং পরিচয়ের রাজনীতির প্রকাশ স্পষ্ট থাকবে বলে মনে হয়।

আরেকটা বাস্তব সত্য আমাদের বুঝতে হবে, বাংলাদেশে এই ধরনের পরিচয়বাদী রাজনীতি যত জনপ্রিয় হবে, তার রাজনৈতিক সুবিধা ওদিকে বিজেপিও পাবে। ঠিক একইভাবে ভারতে বিজেপির পরিচয়বাদী রাজনীতি যত শক্তিশালী হবে, বাংলাদেশেও পরিচয়বাদী রাজনীতি তত শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এবং বর্তমানেও রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রনেতাদের চীন সফর করতে দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বিএনপির একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কি চীনা প্রভাব বাড়তে শুরু করেছে?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে কূটনীতিতে তারা এখন ‘পাবলিক ডিপ্লোমেসি’র দিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় ‘পিপল-টু-পিপল’ যোগাযোগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চীনের একটা বড় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব অনেক বেশি চাঙা হয়েছে। ভারতের মতো চীনও এক অর্থে আওয়ামী লীগের ওপর অতিনির্ভরশীল ছিল, ফলে চীনের মধ্যেও একধরনের ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছিল, যা ইতিমধ্যে বলেছি। এখন চীন বাংলাদেশে তাদের এই ইমেজ সংকট কাটাতে পাবলিক ডিপ্লোমেসিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আর বাংলাদেশে যে একটি ভারতবিরোধী অবস্থান তৈরি হয়েছে, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাবলিক ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে তারা নিজেদের জায়গাটা সুদৃঢ় করতে চাইছে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটা নতুন তত্ত্ব প্রচার করছে চীন। এতকাল আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে প্রথাগত হেজিমনির ধারণা দেখেছি, এর পরিবর্তে চীন এখন ‘ইন্টারডিপেনডেন্ট হেজিমনির’ কথা বলছে।

এই ইন্টারডিপেনডেন্ট বা পারস্পরিক নির্ভরশীল হেজিমনি দিয়ে তারা বিশ্বকে বোঝাতে চাইছে যে বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থা আসলে একক কোনো পরাশক্তির নয়, বরং এটি একটি ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমেরুর বিশ্ব। এখানে একাধিক পরাশক্তি একসঙ্গে সহাবস্থান করবে। এই পরাশক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক খাতে একধরনের প্রতিযোগিতা যেমন থাকবে, ঠিক তেমনি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতে তারা একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করে যাবে।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ‘অর্থনৈতিক করিডর’ উদ্যোগকে চীন নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: এটা চীনের জন্য খুবই কৌশলগত একটা প্রজেক্ট এবং তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ এটা। মূল লক্ষ্য হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার হয়ে আমাদের মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা। একসময় এই করিডর নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা থাকলেও, ভারত শেষ পর্যন্ত এতে রাজি হয়নি।

বর্তমানে বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতায় চীনের জন্য এখন একটা নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা এখন একটি ত্রিপক্ষীয় ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের এই বন্দরগুলোতে পৌঁছাতে চায়। এর মূল কারণ ওই একটাই—ভারত মালাক্কা প্রণালিসহ ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনকে বিভিন্ন উপায়ে নজরদারি করার চেষ্টা করছে, চীন ঠিক তার বিকল্প হিসেবে এই করিডর ব্যবহার করে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে চায় তাদের ইউনান প্রদেশকে যুক্ত করে।

চীন ও মালয়েশিয়া সফরে রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাধানের সম্ভাবনা দেখতে পান?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: রোহিঙ্গা সংকটের মৌলিক কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা আসলে কম। কারণ, চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিই হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বার্থ; কোনো রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য তারা এই স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে না।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। এমনকি নিজেদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে চীন মিয়ানমার জান্তা সরকারের পাশাপাশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখছে।

চীনের কাছে অর্থনৈতিক স্বার্থের চেয়ে কোনো রাজনৈতিক বা মানবিক সংকট বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের দিকেই হেলে থাকে চীন। তাই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আপাততভাবে চীনের কাছ থেকে অলৌকিক কিছু আশা করা কঠিন।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।