বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে গত দুই দশকে যে নীরব বিপ্লব ঘটেছে, তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ থাই পেয়ারা। একসময় পেয়ারা ছিল মৌসুমি ফল। বর্ষা ও শরৎকাল ছাড়া বাজারে এর উপস্থিতি খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু আধুনিক চাষাবাদ, উন্নত জাতের ব্যবহার ও কৃষকের উদ্ভাবনী দক্ষতার কারণে আজ থাই পেয়ারা সারা বছর উৎপাদন হচ্ছে। ফলে এটি শুধু একটি জনপ্রিয় ফল নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য লাভজনক কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে পেয়ারা উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। কৃষি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে ৩০ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৪ হাজার টনের বেশি। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদন হয়। উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা প্রমাণ করে, দেশের কৃষকরা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী এবং ফলভিত্তিক কৃষির সম্ভাবনা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
থাই পেয়ারার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আর প্রকৃতির নির্দিষ্ট মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল নয়। কৃষক পরিকল্পনা করে ঠিক করতে পারেন, বছরের কোন সময়ে তিনি ফল বাজারজাত করবেন। বাজারে যখন ফলের সরবরাহ কম থাকে, তখন থাই পেয়ারা উৎপাদন করে বেশি দাম পাওয়া সম্ভব হয়। এ কারণেই নাটোর, পাবনা, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরিশাল, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিকভাবে থাই পেয়ারার চাষ দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
বর্তমানে দেশের বড় শহরগুলোতে ফলের দোকানে বিদেশি আপেল, কমলা, মাল্টা ও নাশপাতির পাশে সমান গুরুত্ব নিয়ে জায়গা করে নিয়েছে থাই পেয়ারা। ভোক্তারাও পুষ্টিগুণ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে এ ফলের প্রতি ঝুঁকছেন। এতে একদিকে বৈদেশিক ফলের ওপর নির্ভরতা কমছে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
থাই পেয়ারার উৎপাদন বৃদ্ধি বিদেশ থেকে ফল আমদানি কমাতেও ভূমিকা রাখছে। দেশে পেয়ারা উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বছরে আপেলের আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন।
পেয়ারার জনপ্রিয়তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর পুষ্টিগুণ। প্রতি ১০০ গ্রাম পেয়ারায় প্রায় ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে কমলা ও আপেলের চেয়েও বেশি। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম, আয়রন ও প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেটও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে। পুষ্টিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত পেয়ারা রাখার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। দেশে অপুষ্টি মোকাবিলায়ও পেয়ারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু উন্নত জাতের চারা রোপণ করলেই সাফল্য আসে না। থাই পেয়ারা মূলত পরিকল্পিত বাগান ব্যবস্থাপনার ফসল। সারা বছর ফল পেতে হলে জমি নির্বাচন, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, ছাঁটাই, শাখা বাঁকানো, ফুল-ফল নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাগিং প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হয়। অভিজ্ঞ চাষিরা জানেন, কোন সময়ে গাছে নতুন ডগা তৈরি করতে হবে এবং কখন ফল সংগ্রহের পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ পেয়ারার ফুল নতুন ডগায় আসে; আর সেই ডগা তৈরি করাই বছরব্যাপী উৎপাদনের মূল কৌশল।
বাংলাদেশে কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু ধাননির্ভরতায় সীমাবদ্ধ নয়। পুষ্টি, আয় বৃদ্ধি এবং কৃষির বহুমুখীকরণের জন্য ফলভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। থাই পেয়ারা তার একটি সফল উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে পারলে এ ফল দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
এ ক্ষেত্রে ‘ক্রপ সাইক্লিং’ বা ফলনচক্র ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক যদি বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ৫ থেকে ৭ মাস আগেই পরিকল্পনা নেন, তাহলে তিনি কাঙ্ক্ষিত সময়ে ফল সংগ্রহ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে অমৌসুমে উৎপাদন বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জন সম্ভব।
ব্যাগিং প্রযুক্তিও থাই পেয়ারা চাষে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলের ওপর বিশেষ ব্যাগ ব্যবহার করলে ফলমাছি, রোগবালাই ও কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ফলকে রক্ষা করা যায়। এতে বিষমুক্ত ও আকর্ষণীয় ফল উৎপাদন সম্ভব হয়। বর্তমানে বাজারে যে চকচকে ও দাগমুক্ত থাই পেয়ারা দেখা যায়, তার পেছনে এ প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও থাই পেয়ারা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এক বিঘা জমিতে ১৫০ থেকে ২০০টি কলমের চারা রোপণ করে মাত্র এক বছরের মধ্যেই ফল পাওয়া সম্ভব। তিন থেকে চার বছর বয়সী একটি বাগান থেকে বছরে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। উন্নত ব্যবস্থাপনায় এক বিঘা জমি থেকে ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন ফল উৎপাদনের উদাহরণও রয়েছে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য এটি একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগ।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উইল্ট রোগ, ফলমাছি, মাকড় এবং বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগ অনেক সময় ফলন কমিয়ে দেয়। জলাবদ্ধতা, অনিয়মিত সেচ ও অপরিকল্পিত সার ব্যবস্থাপনাও ক্ষতির কারণ হতে পারে। এজন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ, মানসম্মত চারা সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু ধাননির্ভরতায় সীমাবদ্ধ নয়। পুষ্টি, আয় বৃদ্ধি এবং কৃষির বহুমুখীকরণের জন্য ফলভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। থাই পেয়ারা তার একটি সফল উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে পারলে এ ফল দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
পেয়ারা এখন কেবল একটি ফলই নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার নতুন নাম।
লেখক : ফল বিশেষজ্ঞ ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক, ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
এইচআর/জেআইএম








