চুরির অপবাদ দিয়ে রাজশাহীর দুর্গাপুরে ও লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে দুই কিশোরের হাত বেঁধে মারধর করা হয়েছে। দুই কিশোরকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহীর ঘটনাটি ঘটেছে আজ শুক্রবার সকালে। আর লালমনিরহাটের ঘটনাটি গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে।

রাজশাহীতে নির্যাতনের শিকার কিশোরের বয়স আনুমানিক ১৪ বছর। ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে গাছের সঙ্গে পিছমোড়া করে বেঁধে পেটানো হচ্ছে। কিশোরটি আর্তনাদ করছে। কখনো জোরে চিৎকার করে কাঁদছে। তখন পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘কাঁদলে হাঁসুয়া দিয়ে তোর পায়ের নখ কেটে দেব।’ নিরুপায় শিশুটি তখন বলছে, ‘কাটো, কাটো...।’

জানা যায়, ওই কিশোরের বাবার বাড়ি দুর্গাপুর উপজেলায়। ২০১৮ সালে তার মায়ের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়। এর পর থেকে সে পাশের গ্রামে নানার বাড়িতে থাকে। তার মায়ের আবার বিয়ে হয়েছে, মা ঢাকায় থাকেন। ওই কিশোর মাসখানেক আগে ঢাকায় মায়ের কাছে গিয়েছিল। গতকাল ঢাকা থেকে ফিরে বাবার বাড়িতে যায়।

ওই কিশোরের নানির বাড়ির আবদুর রশিদ ওরফে বাবু নামের এক প্রতিবেশীর দাবি, তাঁর মুঠোফোন ও কিছু টাকা চুরি করে সে পালিয়েছিল।

নির্যাতনের সময় জেরার মুখে শিশুটিকে বলতে শোনা যায়, তার বাবা তাকে ফোন চুরি করতে বলেছেন। চুরি করা টাকাও তার বাবাই নিয়েছেন।

এ বিষয়ে কিশোরের বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্যাতন করে ছেলেকে দিয়ে তাঁর নাম বলানো হয়েছে। বাড়িতে এসে ছেলে সেটা বলেছে। ছেলের কথাও স্থানীয় লোকজন ফোনে ভিডিও করে রেখেছেন। বিষয়টি নিয়ে নাকি সালিস হবে। তখন এগুলো তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে চুরি করে থাকলে আইনের হাতে তুলে দেবে। গাছে বেঁধে তো মারতে পারেন না। আবদুর রশিদ নামের যে ব্যক্তি তাঁর ছেলেকে মেরেছেন, তিনি সম্পর্কে ওই কিশোরের মামা।

আবদুর রশিদ একজন চা–দোকানি। ওই কিশোরের নানি তাঁর ফুফু। সেই সূত্রে আবদুর রশিদ কিশোরের মামা। নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এক মাস আগে ছেলেটি তাঁর (আবদুর রশিদ) বাড়ি থেকে কিছু টাকা ও মুঠোফোন চুরি করে নিয়ে পালিয়ে যায়। বাড়ি এসেছে খবর পেয়ে তিনি আজ সকাল আটটার দিকে তার বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন ওই কিশোরের বাবাও বাড়িতে ছিলেন। মুঠোফোন আর টাকা চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে তার বাবা বলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারবেন না, ছেলেকে নিয়ে যেতে বলেন। তারপর ওই কিশোরকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

আবদুর রশিদ আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ওই কিশোর জানায়, তার বাবা তাকে চুরি করতে শিখিয়ে দিয়েছেন এবং চুরির টাকাও বাবা তার কাছ থেকে নিয়ে নিয়েছেন। তারপর স্থানীয় লোকজন ওই কিশোরকে গাছের সঙ্গে বাঁধেন। তবে মারধর করা হয়নি। বেলা ১১টার দিকে তিনি আবার ছেলেটিকে বাড়িতে দিয়ে এসেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্গাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের একটি ভিডিও তাঁর নজরে এসেছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে লোক পাঠানো হয়েছে। ওই কিশোরের পরিবারের কেউ যদি এসে অভিযোগ করেন তাহলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে দুই হাত বেঁধে মারধর করা হয় এক কিশোরকে

এদিকে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের চন্দ্রপুরের চাপারহাটে মসজিদের মাইক চুরির অভিযোগে গতকাল সকালে এক কিশোরকে (১৫) বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়েছে। মারধরের ৩১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ওই কিশোরের দুই হাত রশি দিয়ে বেধে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে আটকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হচ্ছে। কেউ কেউ লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিলেন, কেউ চড়–থাপ্পড়–লাথি মারছিলেন। একপর্যায়ে লুটিয়ে পড়ে ওই কিশোর।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দৃষ্টিগোচর হলে গতকাল রাতেই ওই কিশোরের সন্ধান করা হয়। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ থানার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার শিকার কিশোর কালীগঞ্জের পাশের উপজেলা হাতীবান্ধার বাসিন্দা। এ ঘটনায় ওই কিশোরের মা বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০–২৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ, মামলার এজাহার ও এলাকার লোকজন সূত্রে জানা যায়, মামলার বাদী ১০–১২ দিন আগে তাঁর দুই ছেলেসহ বাবার বাড়ি কালীগঞ্জে বেড়াতে আসেন। তাঁর এক ছেলে গতকাল বেলা ১১টার দিকে কালীগঞ্জের চন্দ্রপুরের উত্তর বত্রিশ হাজারী গ্রামের চাপারহাট বাজারে একটি মসজিদের সামনে পৌঁছামাত্র আসামিরা পথরোধ করে মসজিদের ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে তাকে আটকে রাখে এবং চোর অপবাদ দিতে থাকেন। ওই কিশোর এর প্রতিবাদ করলে আসামিরা তার দুই হাত বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় লোকজনসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই কিশোরকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে কালীগঞ্জ থানার ওসি আবু সিদ্দিক বলেন, গতকাল রাতে কালীগঞ্জের চাপারহাট বাজারের একটি মসজিদের মাইক চুরির অভিযোগে এক কিশোরকে রশি দিয়ে বাঁশের সঙ্গে দুই হাত বেঁধে মারধর করার ভিডিও পুলিশের নজরে আসে। পরে ওই কিশোরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়। আজ দুপুরে এ ঘটনায় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়। অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। তদন্তের পাশাপাশি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।