বিলের পাশে ছিপ ফেলে বসে থাকা ছেলেটা গত শীতে একটা মাছ তুলেছিল, মাথাটা একদম সাপের মতো চাপা, গায়ে ছোপ ছোপ দাগ। বাড়ি ফিরে দাদুকে দেখানোর পর দাদু বলে দিলেন, ‘এটা টাকি’। পাশের বাড়ির চাচা এসে আবার বললেন, ‘আরে না, এটা চ্যাং’। একই মাছ নিয়ে দুজনের দুই নাম বলা নতুন কিছু নয়।

একই বংশের, ভিন্ন প্রজাতি

দুটো মাছই সর্পমাথা পরিবারের, বিজ্ঞানের ভাষায় Channidae। মাথা সাপের মাথার মতো লাগে বলেই এ নাম। শোল, গজার, তিলাশোলও এই পরিবারের, কেবল আকারে আর স্বভাবে আলাদা। টাকির বৈজ্ঞানিক নাম Channa punctata। punctata শব্দটা এসেছে গায়ের ছোপ ছোপ দাগ থেকে। চ্যাংয়ের নাম Channa orientalis, যদিও কিছু গবেষক একে Channa gachua বলেও চিহ্নিত করেন। প্রজাতি নির্ধারণ নিয়ে মৎস্যবিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো পুরোপুরি মতৈক্য হয়নি। মানুষ যেমন একই পরিবারে জন্মেও আলাদা চেহারার হয়, এই দুই মাছও তেমনই; কাছাকাছি দেখতে, কিন্তু আদতে দুই প্রজাতি।

এযাবৎকালে ধরা পড়া ৫টি দানবীয় মাছ

টাকি চিনবে কীভাবে

টাকি বাংলাদেশের প্রায় সব খাল-বিলে, পুকুরে, বাড়ির পাশের ডোবাতেও মেলে। অঞ্চলভেদে ডাকা হয় ল্যাটা, লাটি, ওকন বা চাইতান নামে। দেখতে শোল মাছের ছোট সংস্করণের মতো, মাথা চাপা, শরীর লম্বাটে আঁশে মোড়া। সাধারণ আকার ১৩ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি, কিন্তু কোনো কোনোটা বেড়ে সাড়ে ৩২ সেন্টিমিটার পর্যন্তও হয়ে যায়। গায়ের দুইপাশে হলদেটে আভা, পেটের দিকে দাগ স্পষ্ট।

মুখ বড়সড়, দাঁত ধারালো। শিকারি স্বভাব বলেই ছোট মাছের পোনা সামনে পেলে রেহাই দেয় না, নিজের প্রজাতির পোনাও খেয়ে নেয় কখনো কখনো। পুকুরে অন্য মাছের সঙ্গে একত্রে এদের চাষ চলে না, আলাদা পুকুরেই চাষ করতে হয়। বর্ষা আর প্রাক্‌-বর্ষায় প্রজনন শুরু হলে পুকুর বা খালের পাড়ের কাছে এক-দেড় মিটার গভীরে জলজ লতাপাতা দিয়ে বাসা বানিয়ে স্ত্রী মাছ ডিম পাড়ে, পুরুষ মাছ সেই ডিমের নিষেক করে। বাচ্চা ফোটার পর মা–বাবা দুজনই পাহারায় থাকে, পোনার ঝাঁক চলাফেরা করার সময় চারপাশে ঘুরে তাদের রক্ষা করে।

গলবিলের কাছে একটা অঙ্গ আছে এই মাছের, ফ্যারেঞ্জিয়াল ডাইভারটিকুলা নামে। এর সাহায্যে পানির বাইরে থেকেও বাতাসের অক্সিজেন টানতে পারে টাকি। পানি শুকিয়ে গেলে বা কাদায় আটকে গেলেও তাই বেশ অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে, যা সাধারণ মাছের পক্ষে অসম্ভব।

চ্যাং কেন কম দেখা যায়

তেলোটাকি, রাগা, ঘাইরা বা গাচুয়া ইত্যাদি নামেও পরিচিত চ্যাং। ইংরেজি নাম Ceylon snakehead, আরেকটা নাম Walking snakehead, কারণ পানির বাইরে এরা একধরনের হাঁটার ভঙ্গিতে নড়াচড়া করতে পারে, যেন মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। শরীরের সামনের দিক প্রায় চোঙাকৃতি, পেছনের দিকে গিয়ে চাপা হয়ে আসে। পাখনার কিনারায় কমলা রঙের একটা ছোঁয়া আছে, দাগ টানা। এ কমলা রংই দূর থেকে দেখেও চ্যাংকে আলাদা করার সবচেয়ে সহজ চিহ্ন।

টাকির চেয়ে আকারে ছোট চ্যাং, আর এখন বাংলাদেশের জলাশয়ে পাওয়া রীতিমতো কঠিন। ২০১২ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এ মাছকে সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় রাখা হয়েছে, ধরা বা শিকার আইনত নিষেধ। টাকির ছবিটা ভিন্ন। আইইউসিএন বাংলাদেশের লাল তালিকায় এখনো বিপদের মুখে নেই বলে ধরা হয় এই মাছ, তাই খাল-বিলে আজও সহজেই মেলে এর দেখা।

পোষা বিড়ালকে কোন মাছ খাওয়াব
এক মাছ বিক্রেতার শোল মাছ মাটিতে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে

পাঁচ ভাইয়ের পরিবার

বাংলাদেশে টাকিজাতীয় মাছের মোট পাঁচ প্রজাতি। টাকি, শোল, গজার, তিলাশোল, চ্যাং। শোল আর গজার আকারে সবচেয়ে বড়, বাজারেও এদেরই বেশি চোখে পড়ে। তিলাশোল একটু কম দেখা যায়। চ্যাং প্রায় লুকিয়েই থাকে এখন জলাশয়ের কোনাকাঞ্চিতে।

একসময় খানাখন্দ আর বিলে এই পাঁচ প্রজাতিই দেখা যেত প্রচুর, এখন আর তেমনটা নেই। মাছের একধরনের ক্ষতরোগ, এপিজুওটিক আলসিরেটিভ সিনড্রোমের প্রকোপ আর জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে এদের সংখ্যা কমেছে অনেকটা। নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়া, রাসায়নিক সারে পানি দূষিত হওয়া, যেখানে-সেখানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরার অভ্যাস, সব মিলিয়ে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এ সংকটে।

টাঙ্গাইলের একটা পুকুরে কয়েক বছর আগে এমন একটা টাকিজাতীয় মাছ পাওয়া গিয়েছিল, যার গায়ের রং কমলা, স্থানীয় লোকজন নাম দিয়েছিল ‘কমলা টাকি’। মৎস্যবিশেষজ্ঞরা তখনো নিশ্চিত করতে পারেননি যে এটা পরিচিত পাঁচ প্রজাতির কোনো রূপভেদ, নাকি একেবারে নতুন কিছু। উত্তর এখনো মেলেনি পুরোপুরি।

তো পরেরবার বিলের ধারে সাপমুখো কোনো মাছ চোখে পড়লে পাখনাটা একটু খুঁটিয়ে দেখো। কমলা রং থাকলে সামনে দাঁড়িয়ে আছে চ্যাং। আইনের সুরক্ষায় থাকা একটা মাছ, যাকে বাংলাদেশের জলে এখন আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সূত্র: ফিশ ফার্মিং বিডিপোষা বিড়ালকে কোন মাছ খাওয়াব