সুন্দরবনকে ঘিরে বনদস্যু ও জলদস্যুদের তৎপরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দীর্ঘ সময়ের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা এবং বনজ সম্পদ আহরণের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না সরকারের রাজস্ব আয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক বনজীবী বননির্ভর পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। এতে যেমন কমছে বন থেকে সম্পদ আহরণ, তেমনি কমে যাচ্ছে বন বিভাগের রাজস্বও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনকে নিরাপদ করা গেলে একদিকে বনজ সম্পদ আইন মেনে আহরণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে পর্যটন ও বনজ সম্পদ থেকে সরকারের রাজস্বও বাড়বে। সেই রাজস্ব আবার সুন্দরবন সংরক্ষণে ব্যয় করার সুযোগ তৈরি হবে।
বৃদ্ধির পর আবার কমেছে রাজস্ব আয়খুলনা পশ্চিম বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত রাজস্ব আয় ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার কমে এসেছে। কিন্তু রাজস্ব আয় ঘুরে ফিরে একই অঙ্কে দাঁড়িয়ে আছে, বৃদ্ধি আর পায়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে বন বিভাগের মোট আয় ছিল প্রায় ৫ কোটি ৪৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৬২ হাজার টাকায়। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৭২ হাজার টাকাতে দাঁড়ায়। তবে সর্বোচ্চ আয় অর্জিত হয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় কমে প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লাখ ৮১ হাজার টাকায় দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন
সুন্দরবনে ৫ বছরে মধু আহরণ কমেছে ৬০ শতাংশ
বন বিভাগ সূত্র জানায়, প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে। বন ও জলজ প্রাণীর প্রজনন মৌসুম নিরাপদ রাখতে বন বিভাগ প্রতি বছর এ সময়ে পর্যটক, জেলে এবং মৌয়ালদের বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে বন পুনরায় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
‘মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনের গভীরে যেতে হয়। অনেক সময় দীর্ঘদিন থাকতে হয় বনে। কিন্তু এখন বনে ঢুকতে গেলে ডাকাতদের ১ থেকে দেড় হাজার টাকা দেওয়া লাগে। তা না হলে ঢুকতে দেয় না বনে, গুলির হুমকি দেয়। আর চোরাই পথ দিয়ে বনে ঢুকলে ডাকাতদের কাছে ধরা পড়লে তো নিস্তার নাই’
বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস বনজ সম্পদ আহরণ ও পর্যটন। কাঠ, গোলপাতা, মধু, মোম, মাছ ধরার পারমিট এবং পর্যটকদের প্রবেশ ফি থেকে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বনজ সম্পদ আহরণে বিভিন্ন বিধিনিষেধ, সংরক্ষণমূলক নীতিমালা এবং পর্যটক কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর পাশাপাশি বনদস্যু ও জলদস্যুদের তৎপরতা বননির্ভর মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দস্যু আতঙ্কে বন ছাড়ছেন বনজীবীরাবনজীবীদের অভিযোগ, দস্যুদের ভয়ে অনেকেই এখন আর আগের মতো বনে যেতে চান না। জীবনহানির আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগও করতে সাহস পান না। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে দস্যুদের কাছে টাকা দিয়ে তথাকথিত ‘টোকেন’ নিয়ে বনে প্রবেশ করতে হয়। তা না হলে অপহরণ করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। একইভাবে নদীপথে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদেরও বিভিন্ন স্থানে আটকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার এই পরিস্থিতির কারণে অনেক বনজীবী বননির্ভর পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন, আর অনেক জেলে সমুদ্রে মাছ ধরাও ছেড়ে দিয়েছেন।
‘এবার মাছ ধরতে গিয়ে ৩০ হাজার টাকা ফাঁদে পড়ে সুদে টাকা এনে জলদস্যুদের দিতে হয়েছে। আমার সঙ্গে দুইজন জেলে ও দুইজন বাওয়ালি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের দুই জেলেকে জলদস্যুরা আটকে রেখে বিকাশে ৩০ হাজার টাকা পরিবারের কাছে থেকে নিয়েছে। এসব কারণে আগামীতে আর মাছ ধরতে যাবো না ভাবছি’
র্যাব-৬ ও কোস্টগার্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু ধাপে ধাপে আবারও দস্যু বাহিনী সুন্দরবনে গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি দুলাভাই বাহিনী ও জাহাঙ্গীর বাহিনীকে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে সুন্দরবনের কয়রা, দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর অঞ্চল, বাগেরহাটের শরণখোলা অঞ্চল ঘিরে ৫-৭টি ছোট বড় ডাকাত দল আছে। প্রতি দলে ২০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত ডাকাত সদস্য আছে। তাদেরকে ধরতে বিশেষ অভিযান প্রায় পরিচালনা করা হয়। অনেক সময় জলদস্যু ও ডাকাতরা গহিন বনের ভেতর ঢুকে যায়। তখন তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নৌকা বা ট্রলারে করে তারা আত্মগোপনে চলে যায়।
দাকোপের বাসিন্দা বনজীবী কুমারেশ নিত্য বলেন, সরকার দিয়ে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে জেলেদের আর ইনকামের পথ থাকে না। আমাদের তখন এনজিওগুলোর কাছে হাত পেতে থাকতে হয়। আর সিজনের সময় দস্যুদের কবলে পড়লে জীবন বাঁচাতে দাদন ব্যবসায়ী ও মহাজনের কাছে থেকে টাকা নেয়া লাগে। সেই টাকা শোধ করতেই নিঃস্ব হয়ে যেতে হয়। আর এখন তো অনেক জেলে দস্যু আতঙ্কে নদীতে মাছ ধরতেও যেতে চান না। ইনকামের চাইতে দস্যুদের হাতে পড়লে জরিমানা বেশি দেওয়া লাগে।
আরও পড়ুন
বিষ-প্লাস্টিক-বর্জ্যে বিপন্ন সুন্দরবন
অন্য একজন বনজীবী সবুর মিয়া বলেন, মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনের গভীরে যেতে হয়। অনেক সময় দীর্ঘদিন থাকতে হয় বনে। কিন্তু এখন বনে ঢুকতে গেলে ডাকাতদের ১ থেকে দেড় হাজার টাকা দেওয়া লাগে। তা না হলে ঢুকতে দেয় না বনে, গুলির হুমকি দেয়। আর চোরাই পথ দিয়ে বনে ঢুকলে ডাকাতদের কাছে ধরা পড়লে তো নিস্তার নাই।
তিনি বলেন, গভীর বনে গিয়ে মধু, মাছ, কাঁকড়া ধরাটাও অনেক কষ্টের। বৃষ্টির সময় তো বসে থাকা লাগে। তারপর আবার ডাকাতদের টাকা দিয়ে লাভের লাভ কিছু থাকে না।
কয়রার জেলে তালেব সরদার বলেন, এবার মাছ ধরতে গিয়ে ৩০ হাজার টাকা ফাঁদে পড়ে সুদে টাকা এনে জলদস্যুদের দিতে হয়েছে। আমার সঙ্গে দুইজন জেলে ও দুইজন বাওয়ালি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের দুই জেলেকে জলদস্যুরা আটকে রেখে বিকাশে ৩০ হাজার টাকা পরিবারের কাছে থেকে নিয়েছে। এসব কারণে আগামীতে আর মাছ ধরতে যাবো না ভাবছি।
ষাটোর্ধ্ব বনজীবী বাদশা মিয়া বলেন, বাওয়ালি আর মৌয়ালীদেরও এখন বনে ঢুকতে দস্যুদের টাকা দিতে হয়। নৌকা প্রতি ১০-১২ হাজার আর জনপ্রতি ১ থেকে দেড় হাজার টাকা গুনতে হয়। এজন্য অনেকে বনে যাওয়া বাদ দিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ফরেস্টের কর্মকর্তারাও ডাকাতদের কাছে জিম্মি। তাদের অনেকবার বললেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কিছুদিন আগে কয়রা থেকে এক ডাকাত বাহিনীর ৫-৬ জনকে কোস্টগার্ড আটক করে। কিন্তু বাহিনীর সবাইকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এজন্য বনজীবীদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়েছে।
আরও পড়ুন
অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের বাঘ
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের খুলনা শাখার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ আইনগত দিক মেনে আহরণ করার সুযোগ রয়েছে। সুন্দরবনের অনেক সম্পদ রয়েছে যা আহরণ না করলে তাদের প্রাকৃতিক উৎপাদন হয় না। যেমন- গোলপাতা, মধু এক ধরনের সম্পদ। কিন্তু আহরণ হতে হবে আইন মেনে। তাহলে সুন্দরবনকে রক্ষা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে বনদস্যু ও জলদস্যুতা নির্মূলে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পদক্ষেপ না নিলে পর্যটন শিল্পে ধস নামবে। আর বনজীবী ও জেলেরা সম্পদ আহরণে যেতে চাইবে না। সুন্দরবন নিরাপদ হলে এবং এখান থেকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেলে, সুন্দরবনের এবং পরিবেশ রক্ষায় সরকার আদায়কৃত রাজস্ব থেকে ব্যয়ও করতে পারবে।
যা বলছেন কর্তৃপক্ষসুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, করোনাকালীন সময়ে সুন্দরবন থেকে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানান প্রতিকূলতায় মুখে বনজীবীরা পড়েন। আমরা এ সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করছি। আর রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির জন্যও চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, এছাড়া প্রতি বছরে তিন মাস বন ও জলজ প্রাণীর প্রজনন মৌসুমকে নিরাপদ রাখতে বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে। এরপর আবার উন্মুক্ত করা হয়। বনজীবীরা এই তিন মাস বনে প্রবেশ করতে পারবেন না। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আবার বনে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে সুন্দরবনকে সব ধরনের সমস্যা থেকে নিরাপদ রাখতে আমরা কাজ করছি।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জাগো নিউজকে বলেন, প্রতি মাসে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভায় এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়। আমরা এই বিষয়ে কাজ করছি।
তিনি বলেন, সম্প্রতি জাহাঙ্গীর বাহিনী ও দুলাভাই বাহিনীর সক্রিয় একাধিক সদস্য আটক হয়েছে। বাকিদের আটক করতে এবং সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে আমরা কাজ করছি।
আরিফুর রহমান/কেএইচকে








