আমরা যখন হাঁটি বা দৌড়াই, তখন মনে হয় সব কাজ বুঝি শুধুই পায়ের। কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় আমাদের হাতও সমানভাবে অংশ নেয়। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের হাঁটার গতি কেমন তার ওপর নির্ভর করে হাত দুটি কেমন করে নড়বে।
সাধারণ গতিতে হাঁটার সময় হাত সাধারণত শরীরের দুপাশে স্বাভাবিকভাবে দুলতে থাকে। কিন্তু গতি বাড়িয়ে যখনই আমরা দৌড়াতে শুরু করি, তখনই হাত দুটি আপনা–আপনি কনুইয়ের কাছে ভেঙে বা বেঁকে যায়। কখনো কি ভেবে দেখেছ, এমনটা কেন হয়?
গবেষকেরা ২০১৯ সালে মানুষের এই হাত নাড়ানোর পেছনের কারণ নিয়ে ‘জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি’ জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, হাত কীভাবে রাখলে শরীরের শক্তি সবচেয়ে বেশি বাঁচে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাত সোজা রেখে হাঁটার চেয়ে কনুই বাঁকা করে হাঁটলে শরীরের শক্তি আসলে বেশি খরচ হয়। অর্থাৎ হাত সোজা রেখে হাঁটাটাই শরীরের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক ও শক্তি–সাশ্রয়ী।
শুধু এক পদের খাবারে কি বেঁচে থাকা সম্ভবমূলত সোজা হাতের চেয়ে কনুই থেকে বাঁকানো হাতের দোলার পথ বা দূরত্ব বেশ ছোট হয়। আর পথ ছোট মানে কাজও কম। তাই বাঁকানো হাত সামনে পেছনে দোলাতে শরীরের শক্তিও কিছুটা কম খরচ হওয়ার কথা। বিজ্ঞানীদেরও শুরুতে ঠিক এমনটাই ধারণা ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন, হাঁটা হোক বা দৌড়ানো, সব সময়ই কনুই বাঁকা করে রাখলে সম্ভবত শরীরের শক্তি বাঁচে এবং বেশ আরাম পাওয়া যায়।
কিন্তু বাঁকানো হাতে যদি সত্যিই শক্তি বাঁচে, তাহলে সাধারণ গতিতে হাঁটার সময় আমরা কেন আপনা–আপনি হাত সোজা করে রাখি? কেন দৌড়ানোর মতো কনুই বাঁকিয়ে রাখি না?

এই কারণ জানতে বিজ্ঞানীরা বেশ মজার পরীক্ষার আয়োজন করলেন। তাঁরা চারজন নারী ও চারজন পুরুষ মোট আটজনকে একটি ট্রেডমিলের ওপর একবার হাত সোজা রেখে, আরেকবার কনুই বাঁকা করে হাঁটতে ও দৌড়াতে বললেন। চোখের দেখায় যেন কোনো ভুল না হয়, তাই বিজ্ঞানীরা ক্যামেরার বদলে ব্যবহার করলেন অত্যাধুনিক ইনফ্রারেড ক্যামেরা আর মোশন ক্যাপচার সফটওয়্যার। এগুলো দিয়ে মানুষগুলোর প্রতিটি নড়াচড়া একেবারে নিখুঁতভাবে রেকর্ড করা হলো। এরপর সেই রেকর্ড করা তথ্য দিয়ে কম্পিউটারে তৈরি করা হলো তাঁদের শরীরের থ্রিডি মডেল। উদ্দেশ্য একটাই, হাঁটা আর দৌড়ানোর সময় হাত বাকাঁনোর কারণটা জানা।
পরীক্ষার দুই সপ্তাহ পর, অংশগ্রহণকারীদের মুখে একটি বিশেষ শ্বাসপ্রশ্বাসের মাস্ক পরিয়ে আবার একইভাবে ট্রেডমিল চালানো হয়। মাস্কের সাহায্যে গবেষকেরা মূলত তাঁদের শরীরের বিপাকীয় তথ্য সংগ্রহ করেন, যা থেকে নিখুঁতভাবে জানা যায় যে কোন অবস্থায় শরীরের ঠিক কতটা শক্তি খরচ হচ্ছে।
রঙের সঙ্গে পাখির বিলুপ্তির সম্পর্ক খতিয়ে দেখছেন গবেষকেরাবিজ্ঞানীদের এই পরীক্ষায় জানা যায় এক অদ্ভুত তথ্য। দৌড়ানোর সময় যখন অংশগ্রহণকারীদের হাত সোজা রাখতে বলা হয়েছিল, তখন তাঁরা জানান এভাবে দৌড়ানো তাঁদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর ও কষ্টকর ছিল। তবে যন্ত্রের হিসাবে দেখা গেল, হাত বাঁকা রাখা বা সোজা রাখা, যেভাবেই দৌড়ানো হোক না কেন, শরীরের শক্তি খরচের পরিমাণের মধ্যে তেমন কোনো বড় পার্থক্য নেই।

আসল কারণটা দেখা গেল হাঁটার ক্ষেত্রে। বিজ্ঞানীরা খেয়াল করলেন, যখন মানুষ কনুই বাঁকা করে হাঁটে, তখন তাদের শরীরের শক্তি খরচ প্রায় ১১ শতাংশ বেড়ে যায়। এর সহজ কারণ হলো, হাঁটার মতো ধীরগতির সময়ে জোর করে হাত বাঁকিয়ে ধরে রাখতে পেশিকে বাড়তি খাটতে হয়। এই পরীক্ষা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কেন আমরা হাঁটার সময় বাড়তি শক্তি অপচয় না করে হাত দুটিকে স্বাভাবিকভাবে সোজা রেখে দিই। তবে দৌড়ানোর সময় মানুষ ঠিক কেন আপনা–আপনি হাত বাঁকিয়ে ফেলে, সেই কারণটা বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি জানতে পারেননি।
অবশ্য ২০১৪ সালের অন্য একটি গবেষণা এ বিষয়ে একটি ধারণা দিয়েছিল। ‘জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি’তে প্রকাশিত সেই গবেষণায় দেখা যায়, দৌড়ানোর সময় হাত দোলাতে কিছুটা শক্তি খরচ হলেও, হাত দুটোকে জোর করে এক জায়গায় স্থির বা শক্ত করে রাখতে তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। কারণ, হাত যখন স্বাভাবিকভাবে দোলে, তখন তা দৌড়ানোর ঝাঁকুনিতে শরীরের ওপরের অংশের অনাকাঙ্ক্ষিত নড়াচড়া কমিয়ে দিয়ে পুরো দেহের ভারসাম্য ধরে রাখে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্সমরুভূমিতে ৬৬ বিলিয়ন গাছ লাগানোয় চীনে ঘটছে অদ্ভুত কাণ্ড







