বাংলাদেশে ডায়াবেটিস এখন নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, প্রতি ১১ জন মানুষের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত দুজনের মধ্যে একজন জানেনই না যে, তিনি ডায়াবেটিসে ভুগছেন। সচেতনতার অভাব, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণে অনীহার কারণে অনেক রোগী জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। ডায়াবেটিস শুধু একটি রোগ নয়; এটি নানা জটিলতার দ্বারও খুলে দেয়।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে চোখের দৃষ্টি হারানো, কিডনি বিকল হওয়া, হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্নায়ুর ক্ষতি, চর্মরোগ, দাঁত ও মাড়ির সমস্যা, এমনকি পা কেটে ফেলার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত বিকল্প চিকিৎসা, গাছ-গাছড়া বা অবৈজ্ঞানিকভাবে প্রস্তুতকৃত ওষুধের ওপর নির্ভরতা রোগীর অবস্থা আরও জটিল করে তোলে।
এ বাস্তবতায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক নেটওয়ার্ক (বিডিএন)। প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে শহর থেকে গ্রাম অবধি ছোট-বড় কেন্দ্র স্থাপন করে চিকিৎসাসেবা এবং নিয়মিত কাউন্সেলিং কার্যক্রমের মাধ্যমে রোগীদের সচেতন করে তুলতে কাজ করছে। তাদের বিশ্বাস, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের চেয়ে প্রতিরোধই অধিক কার্যকর এবং সহজ।
বিডিএনের কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রোগীকেন্দ্রিক পরামর্শসেবা। শুধু ওষুধনির্ভর চিকিৎসার বাইরে গিয়ে খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, শারীরিক ব্যায়াম এবং মানসিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সময়মতো শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা গেলে রোগটির বিস্তার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ডা. এস. এম আকমাল আলী জানান, দেশে ডায়াবেটিস বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক মানুষ রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেন না। আবার কেউ কেউ চিকিৎসকের পরামর্শের পরিবর্তে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বিডিএন বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং এবং জীবনধারা পরিবর্তনের পরামর্শের মাধ্যমে তারা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে। বিশেষ করে কাউন্সেলিংভিত্তিক সেবার মাধ্যমে রোগীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডায়াবেটিস মোকাবিলায় ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ-সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সঠিক তথ্য, নিয়মিত পরীক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়াবেটিসজনিত অধিকাংশ জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। নীরবে ছড়িয়ে পড়া এ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক নেটওয়ার্কের (বিডিএন) উদ্যোগ তাই নতুন আশার সঞ্চার করছে।








