(পূর্ব প্রকাশের পর-৬ষ্ঠ পর্ব)

আব্বা বদলি হলেন দেবীদ্বারে। শৈশব কাটিয়ে আমিও প্রবেশ করলাম কৈশোরে। এই বয়স সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ছুটি’ গল্পে লিখেছেন—

“বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি। শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয়।”

রবীন্দ্রনাথ যে বয়সকে ‘এমন বালাই’ বলেছেন, সেই ‘বালাই’ হয়েই আমি সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম দেবীদ্বার আর এম পাইলট হাই স্কুলে। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি কুমিল্লা সদর থেকে উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা পিচঢালা সড়কের লাগোয়া। সড়কের এক পাশে বিশাল খেলার মাঠ, অন্য পাশে স্কুল কম্পাউন্ড। ভরা বর্ষায় প্রমত্তা গোমতী নদী, যা ছিল অতি নিকটে, প্রায় প্রতি বছরই ভাঙনের কবলে ফেলে দিত দেবীদ্বারের মাঠ-ঘাট, প্রান্তর এবং স্কুলের আঙিনা। হুয়াংহো নদী যেমন চীনের দুঃখ, তেমনি তখন গোমতী নদী ছিল দেবীদ্বার তথা পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের দুঃখের কারণ।

রবীন্দ্রনাথ যে বয়সকে ‘এমন বালাই’ বলেছেন, সেই ‘বালাই’ হয়েই আমি সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম দেবীদ্বার আর এম পাইলট হাই স্কুলে। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি কুমিল্লা সদর থেকে উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা পিচঢালা সড়কের লাগোয়া। সড়কের এক পাশে বিশাল খেলার মাঠ, অন্য পাশে স্কুল কম্পাউন্ড। ভরা বর্ষায় প্রমত্তা গোমতী নদী, যা ছিল অতি নিকটে, প্রায় প্রতি বছরই ভাঙনের কবলে ফেলে দিত দেবীদ্বারের মাঠ-ঘাট, প্রান্তর এবং স্কুলের আঙিনা।

দেবীদ্বার হাই স্কুলের পাশেই ছিল আমাদের বাসা। বাসা-সংলগ্ন ছিল আব্বার অফিস, যেখানে প্রাইমারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়মিত আনাগোনা লেগেই থাকত। একবার এক শিক্ষক বড় একটি মাছ নিয়ে এসেছিলেন বদলির বিষয়ে কথা বলতে। মনে আছে, আব্বা প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তাঁকে প্রায় তাড়িয়েই দিয়েছিলেন। মিন্নত আলী নামে এক শিক্ষক ছিলেন—উচ্চতায় প্রায় সাত ফুট, কিন্তু কথাবার্তায় অত্যন্ত সরল প্রকৃতির। আব্বা মজা করে বলতেন, “মিন্নত আলী, আল্লাহ তোমাকে শুধু দৈর্ঘ্যই দিলেন, প্রস্থ দিলেন না—বড় আফসোস!”

বাসার সামনে আধাপাকা একটি ঘরে স্কুল হোস্টেলের এক কক্ষে চার-পাঁচজন ছাত্র থাকত। অঙ্কের শিক্ষক ওয়াহাব স্যার ছিলেন হোস্টেলের সুপার। বাসা থেকে প্রায়ই দেখতাম, সন্ধ্যা নামলেই ছাত্ররা হারিকেনের চিমনি পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ প্লেট-গ্লাস হাতে খাবারঘরে যাচ্ছে, কারও গায়ে গামছা, পরনে লুঙ্গি। হোস্টেলে বয়সে বড় ছাত্রও ছিল। যেমন নসু ভাই—স্কুল ফুটবল দলের খেলোয়াড়। আদু ভাইয়ের মতো তিনিও বছরের পর বছর ফেল করতেন। কথিত ছিল, শুধু ফুটবল খেলার জন্যই তিনি স্কুল ছাড়তে চাইতেন না। একদিন মুরগি কিংবা খাসি চুরির অভিযোগ উঠল। সেই সূত্রেই শুনলাম, আমাদের বাসার দুটি মোরগও নাকি উধাও হয়ে গেছে।

হোস্টেলের ছাত্ররা গভীর রাত পর্যন্ত হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করত। তারপর ঘুম পেলে দল বেঁধে পাকা সড়কে খালি গায়ে, কাঁধে গামছা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে গান গাইত। মাঝেমধ্যে আমিও তাদের সঙ্গী হতাম। ফার্স্ট বয় নুরুর কণ্ঠ ছিল অসাধারণ, বিশেষ করে লতা মঙ্গেশকরের এই গানটি সে খুব সুন্দর গাইত—

“কত যে কথা ছিল, কত যে ছিল গান,
কত যে বেদনা আর না-বলার অভিমান...”

ওখানে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বসন্ত কুমার দাস বিদায় নিলেন। তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতে চলে গেলেন। ইংরেজি পড়াতেন, তাঁর লেখা একটি ব্যাকরণ বইও বাজারে পাওয়া যেত। কয়েক দিন পর আমাদের ক্লাসের সেকেন্ড বয় নেপালও চলে গেল ভারতে। গৌরীপুরের বাসন্তী, কল্পনা কিংবা এখানে বসন্তবাবু ও নেপাল কেন পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে যাচ্ছিলেন—সেই বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তখন আমার ছিল না। তবে তাদের চলে যাওয়ায় হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হতো, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পরে অবশ্য কারণটি বুঝতে অসুবিধা হয়নি। নিরাপত্তাহীনতা এবং নীরব নির্যাতনই ছিল তার মূল কারণ।

যাই হোক, বসন্তবাবু এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাঁকে বিদায় জানাতে আমরা তিন-চার মাইল তপ্ত রোদে হেঁটে আখাউড়ামুখী কোম্পানীগঞ্জ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলাম।

আধাপাকা টানা বারান্দাওয়ালা স্কুল ভবন। শেষ প্রান্তের দু-তিনটি কক্ষ ছিল প্রধান শিক্ষকের বাসভবন। স্কুল কম্পাউন্ডের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা ভবনের ছাদের কার্নিশে ইংরেজিতে লেখা ছিল— Learning is Light (জ্ঞানই আলো)। বড় হয়ে শুনেছি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনেও দীর্ঘদিন এই কথাটি লেখা ছিল। পরে নাকি ‘Learning’-এর প্রথম অক্ষর ‘L’ মুছে বা ঝাপসা হয়ে যাওয়ায় সেটি দাঁড়িয়েছিল Earning is Light (উপার্জনই আলো)। আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে মনে হয়, একসময় প্রথম কথাটিই সত্য ছিল; এখন দ্বিতীয় কথাটিই যেন নির্মম বাস্তবতা।

যাক সে কথা। বসন্তবাবুর বিদায়ের পর প্রধান শিক্ষক হলেন নওয়াব আলী স্যার। দীর্ঘদেহী, সুঠাম গড়নের মানুষ। ইতিহাসে অনার্স ও এমএ; আধুনিক ইংরেজিতে তাঁর ছিল অসাধারণ দখল। অঙ্ক যেন ওয়াহাব স্যার, সোবহান স্যার ও মান্নান স্যারের হাতের খেলনা। সমাজপাঠে রবীন্দ্র স্যার ও মান্নান স্যার ছিলেন অনন্য। আমাদের প্রত্যেক শিক্ষকই নিজ নিজ বিষয়ে ছিলেন পণ্ডিত।

তবে বাংলার অনিল স্যার ও ইংরেজির ধীরেন স্যার ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। অভাব-অনটন আর অসুস্থতার মধ্যেও তাঁরা নিয়মিত ক্লাস নিতেন। অনিল স্যার শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, এমনকি নিহাররঞ্জন রায়ের লেখাও উদ্ধৃতিসহ বোঝাতেন। সিলেবাসের গণ্ডির মধ্যে নিজেকে কখনো সীমাবদ্ধ রাখতেন না। অন্যদিকে ধীরেন স্যার ছেঁড়া পাঞ্জাবি, পুরোনো স্যান্ডেল আর মলিন ধুতি পরে অনর্গল ইংরেজি Phrase ও Idiom আওড়ে যেতেন। তখন বুঝিনি, পরে উপলব্ধি করেছি—জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার সম্পর্ক সব সময় সমানুপাতিক নয়।

দেবীদ্বার স্কুলে খেলাধুলারও ছিল চমৎকার পরিবেশ। ফুটবল, হকি, ক্রিকেট, ভলিবল—সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল। এমনকি একটি জিমনেশিয়ামও ছিল। গেমস টিচার আব্দুল লতিফ স্যার ছিলেন লম্বা, সুঠামদেহী মানুষ। ফুটবল খেলার নিয়মকানুন নিয়ে তিনি বইও লিখেছিলেন। আমি সব খেলাতেই অংশ নিতাম। আব্বা কুমিল্লা থেকে আমার জন্য ফুটবল বুট, সকস, ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় খেলাধুলার সরঞ্জাম কিনে আনতেন। ইন্টার-স্কুল প্রতিযোগিতায় খেলতাম। এমনকি দু-চার আনা পারিশ্রমিকের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ভাড়ায় খেলতেও যেতাম।

একসময় দেশভাগের মতো আমাদের ক্লাসও ভাগ হয়ে গেল—বিজ্ঞান ও কলা বিভাগে। ফার্স্ট বয় নুরুল ইসলাম, সেকেন্ড বয় নেপাল চন্দ্রসহ মেধাবী ছাত্ররা চলে গেল বিজ্ঞান বিভাগে। অঙ্কে দুর্বল হওয়ায় আমি রয়ে গেলাম কলা বিভাগে। সে সময় বিজ্ঞান বিভাগে পড়া মানেই ভবিষ্যতে ডাক্তার বা প্রকৌশলী হয়ে উজ্জ্বল জীবন গড়া—এমন ধারণাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিপরীতে কলা বিভাগে পড়া মানে যেন ভাগ্যহত মানুষের কাতারে নাম লেখানো।

মূলত তিনটি কারণে দেবীদ্বার আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

প্রথমত, দেবীদ্বার আর এম পাইলট হাই স্কুল থেকেই আমি এসএসসি পাস করি।

দ্বিতীয়ত, সংবাদপত্র পড়া এবং লেখালেখির প্রতি আমার গভীর আগ্রহের সূচনা এখানেই। অষ্টম শ্রেণি থেকেই নিয়মিত পোস্ট অফিসে যেতাম। পোস্টমাস্টার কাকা আমাকে স্নেহ করে Morning News, Pakistan Observer, দৈনিক বাংলা, সংবাদসহ বিভিন্ন পত্রিকা পড়ার সুযোগ করে দিতেন। বলাবাহুল্য, আব্দুস সালাম, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, জহুর হোসেন চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত প্রমুখ প্রথিতযশা সাংবাদিক ও কলামিস্টের লেখা আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। পরবর্তী সময়ে বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষার বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায়, যেমন The Daily Star, ভোরের কাগজ, The Financial Express প্রভৃতিতে কলাম লেখার পেছনে তাঁদের লেখাই ছিল আমার প্রধান অনুপ্রেরণা। দেবীদ্বার নামের ছোট্ট জনপদটি তাই আমার লেখকজীবনেরও ভিত্তি হয়ে আছে।

তৃতীয়ত, কৈশোরেই আমার রাজনৈতিক চেতনার বীজ রোপিত হয়েছিল দেবীদ্বারে। ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করি, পশ্চিম পাকিস্তান অব্যাহতভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করছে, আর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তার প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছে। এই উপলব্ধি আমার কিশোর মনে গভীরভাবে দাগ কেটে যায়। পরে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে রাজনীতি সম্পর্কে আমার কৌতূহল ও আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

তখন কনভেনশন মুসলিম লীগের যুগ। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতায়, বিরোধী দলগুলোর অধিকাংশই ছিল কার্যত কোণঠাসা। দেবীদ্বার এলাকারই সন্তান ছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মফিজউদ্দিন আহমদ। তিনি কুমিল্লায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং অনুমোদনের কাজও প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, তৎকালীন স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগে নানা রাজনৈতিক কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজের এলাকা চট্টগ্রামে নিয়ে যান। সেটিই পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে মফিজউদ্দিন আহমদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ক্ষোভও বাড়তে থাকে। মনে পড়ে, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে যখন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল, তখন আমরাও দেবীদ্বার স্কুল থেকে কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে মিছিল করে বেশ দূরের জাফরগঞ্জ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। রাজনীতি তখনও পুরোপুরি বুঝতাম না, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ যে কত শক্তিশালী হতে পারে, তার প্রথম পাঠ সেখানেই পেয়েছিলাম।

আরেকটি ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পরপরই অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ছিলেন ফাতিমা জিন্নাহ। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক ছিল হারিকেন। অপরদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রতীক ছিল গোলাপ ফুল। চারদিকে আইয়ুব খানের পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছিল এলাকা। একটি পোস্টারের কথাগুলো আজও মনে আছে—

“জোটে যদি মোটে একটি পয়সা, খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি;
দুটি যদি জোটে, তবে অর্ধেক তার ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী।”

ফাতিমা জিন্নাহর পক্ষেও পোস্টার ছিল, তবে সেগুলো তেমন আকর্ষণীয় ছিল না।

একদিন মাইকে প্রচার শুনলাম, সম্মিলিত বিরোধী দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেবীদ্বারে আসছেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই প্রথম তাঁকে সরাসরি দেখার সুযোগ হলো। দীর্ঘদেহী, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ; কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রনিনাদের মতো। জনসভায় অনেক কথাই বলেছিলেন। তবে একটি বাক্য আজও কানে বাজে। আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেছিলেন—

“যদি ফাতিমা জিন্নাহরে ভোট না দাও, যদি আইয়ুব খাঁ পাশ করে, তাইলে মান্দার গাছে গোয়া ঘষতে অইব।”

রাজনৈতিক বক্তব্যের গভীরতা তখন বুঝিনি, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং জনতার উচ্ছ্বাস আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

মাঝেমধ্যে ঢাকা থেকে প্রধান শিক্ষক নওয়াব আলী স্যারের বড় ভাই ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী কাছিম মার্কা ভক্সওয়াগন গাড়ি চালিয়ে দেবীদ্বারে আসতেন। স্কুল কম্পাউন্ডে গাড়ি রেখে তিনি গ্রামের বাড়িতে যেতেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দেবীদ্বার কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এ সময় আব্বা ১৭০ বা ১৮০ টাকা দিয়ে চার-ব্যান্ডের একটি ফিলিপস রেডিও কিনলেন। মফস্বলে কিংবা অফিসে না গেলে দিনের অধিকাংশ সময়ই রেডিওটি তাঁর সঙ্গী হয়ে থাকত। যেন যক্ষের ধন। এক হাতে হুক্কার নল, অন্যদিকে অফিসের টুকিটাকি কাজ—আর সারাক্ষণ রেডিও। তিনি ছিলেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের একনিষ্ঠ সমর্থক। মোহামেডান গোল করলেই আনন্দে এমন লাফিয়ে উঠতেন, যেন গোলটি তিনিই করেছেন।

ক্রিকেটের ধারাভাষ্যও তিনি নিয়মিত শুনতেন। তাঁর মুখে হানিফ মোহাম্মদ, জাভেদ বারকি, সাঈদ আহমদ, নাসিমুল গনি, ইন্তেখাব আলম, ইজাজ বাট—এমন অনেক ক্রিকেটারের নাম প্রথম শুনেছিলাম। খেলাধুলার প্রতি আমার আগ্রহেও তাঁর যথেষ্ট উৎসাহ ছিল। তিনি নিয়মিত আমার জন্য ফুটবল বুট, সকস, ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় খেলাধুলার সরঞ্জাম কিনে দিতেন।

রমজান মাসের শেষে রেডিওতে যখন ঘোষণা হতো, “চাঁদ দেখা গেছে”, তারপরই ভেসে আসত—‘ও মোর রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’—তখন আব্বা আনন্দে চিৎকার করে উঠতেন, “কাল ঈদ! কাল ঈদ!” তাঁর সেই উচ্ছ্বাসে যেন পুরো পাড়া মুখর হয়ে উঠত।

স্কুলজীবনে লেখাপড়া আমাকে কখনোই ততটা আকৃষ্ট করেনি, যতটা আকৃষ্ট করত গান-বাজনা, যাত্রা, সার্কাস, নাটক, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর খেলাধুলা। ছাত্র হিসেবে ছিলাম মাঝামাঝি মানের—ইংরেজিতে যাকে বলে mediocre। এমনকি এসএসসি পরীক্ষার মাত্র দুদিন আগেও ভাড়ায় ফুটবল খেলতে গিয়ে খোঁড়া হয়ে ফিরেছিলাম। আব্বার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন, আল্লাহই জানেন।

তখন এসএসসি পরীক্ষা দিতে যেতে হতো কুমিল্লা শহরে। তাই আমাকে এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠানো হলো। থাকার ব্যবস্থা হলো গোয়ালঘরের পাশের একটি ছোট কক্ষে। পড়াশোনার পরিবেশ তো দূরের কথা, সারারাত গোবরের গন্ধ আর গরুর হাম্বা-হাম্বা ডাক শুনতে শুনতে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। পরদিন ভোরেই সেখান থেকে সরে গিয়ে কুমিল্লা জেলখানার লাগোয়া দূরসম্পর্কের এক নানার বাসায় আশ্রয় নিলাম।

গিয়ে দেখি, গৌরীপুর স্কুলের আমার এক সহপাঠীও সেখানে উঠেছে। সে ছিল আমাদের ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টের আদরের মেয়ে। পরিচিত মুখ দেখে বেশ খুশিই হয়েছিলাম। কিন্তু সে-ই হয়ে উঠল নতুন বিপদের কারণ। সারারাত সামনের কলোনির এক মেয়ের সঙ্গে গল্প-গুজব আর ইশারায় ব্যস্ত থেকে আমার ঘুম ও পরীক্ষার প্রস্তুতি—দুটোই শিকেয় তুলে দিল। অগত্যা লালচোখে, না-ঘুমানো ক্লান্ত শরীর নিয়েই পরীক্ষার হলে যেতে হলো।

কিন্তু বিপদ যেন আমার পিছু ছাড়ল না। পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল জেলখানার কাছের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। পথে হঠাৎ জেলখানার পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠল। নিয়ম ছিল, ঘণ্টা বাজলে যে যেখানে থাকবে, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমিও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। পরে যখন পরীক্ষার কক্ষে পৌঁছালাম, দেখি আমার ছাড়া সবাই ইতোমধ্যে প্রশ্নের উত্তর লেখা শুরু করে দিয়েছে। সেদিনের সেই উৎকণ্ঠা আজও ভুলতে পারিনি।

অবশেষে ফল প্রকাশিত হলো। আমি ৫৯৮ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হলাম। মাত্র দুই নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ হাতছাড়া হয়েছিল। অথচ ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় স্থানীয় ছেঙ্গারচর হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন আমার আব্বা। ফলে আমার ফলাফল দেখে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তাঁর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন আমাকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করতেও দ্বিধা করবেন না। আমি মাথা নিচু করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামির মতো নীরবে সব শুনে যাচ্ছিলাম।

ঠিক সেই সময় কুমিল্লা থেকে ছুটে এলেন আমার ছোট কাকা এম. সামসুল হক। তিনিই আমাকে রক্ষা করলেন। আব্বাকে বললেন, “মাত্র দুই নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ মিস করেছে। এতে এত হতাশ হওয়ার কী আছে?” তারপর আমাকে কাছে টেনে নিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। তাঁর কথায় নতুন করে সাহস পেলাম।

সেদিনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম—আর নয় খেলাধুলায় অতিরিক্ত সময় নষ্ট। এবার নিজেকে পুরোপুরি পড়াশোনায় মনোযোগী করব। সেই সংকল্প নিয়েই জীবনের নতুন অধ্যায়ের উদ্দেশে পা বাড়ালাম। আমার পরবর্তী গন্তব্য—কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ।

(চলবে)

লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/এএসএম