ডেঙ্গু এখন আর নতুন কোনো রোগ নয়। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশে আমরা এডিস মশাবাহিত এ রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। ভবিষ্যতেও ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
তাই আতঙ্কিত না হয়ে ডেঙ্গুর সঙ্গে বসবাসের বাস্তবতা মেনে নিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে রোগটির বিস্তার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে জাগো নিউজ আয়োজিত ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ পরামর্শ দেন।
আরও পড়ুন
ময়মনসিংহ / ফগিংয়ের ধোঁয়া আছে-স্বস্তি নেই, বাড়ছে ডেঙ্গুর ভয়
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর সিজন (মৌসুম) এলে আমরা বসি, অনেক সময় আলাপ-আলোচনাও করি। কিন্তু ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঝে-মধ্যে আলোচনা করলে আর হবে না। সারা বছরই সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। কারণ এটি মৌসুমি হলেও এখন প্রায় সারা দেশেই বিস্তার লাভ করেছে।
ডেঙ্গু কোনো নতুন রোগ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ২০০০ সাল থেকেই আমরা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তারও আগে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর রোগী শনাক্ত হয়েছিল। মশা ছিল, মশা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ডেঙ্গুর সঙ্গে আমাদের বসবাস করতেই হবে। তবে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা
দেশের মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন জানিয়ে ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, অনেক রোগী চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই বুঝতে পারেন যে, তার ডেঙ্গু হয়েছে। তবে সচেতনতার এ ধারা ধরে রাখতে নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে। সবাইকে প্রতিদিনই মনে করিয়ে দিতে হবে যে, কীভাবে এডিস মশার বিস্তার রোধ করে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। শুধু সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপর দায় চাপিয়ে লাভ নেই। যদি দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভালোভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করে কিন্তু উত্তর সিটি না করে, তাহলে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। একইভাবে শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
‘আমরা ঢাকার কথা বেশি বলি। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ডেঙ্গু এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলা, গ্রাম সব জায়গাতেই রোগী পাওয়া যাচ্ছে,’ বলছিলেন ডা. আব্দুল্লাহ।
নগরায়ন যত বাড়ছে, এডিস মশাও তত বিস্তার লাভ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, এডিস মশা কিন্তু তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ও উন্নত পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। আগে যেসব সুযোগ-সুবিধা শুধু শহরে ছিল, এখন গ্রামেও বহুতল ভবন, বিদ্যুৎ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক আবাসন গড়ে উঠছে। ফলে মশার বিস্তারও বাড়ছে।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু রোগীর তথ্যে গরমিল, দিশাহারা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন
এছাড়া বাস, ট্রেন ও বিমানের মতো যানবাহনের মাধ্যমে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় মশা সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রীরা ওঠার পর এত মশা দেখা গিয়েছিল যে, ফ্লাইট ছাড়তে দুই ঘণ্টা দেরি হয়েছিল। অর্থাৎ, মশা শুধু মানুষের সঙ্গে নয়, বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমেও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে।
নিজ ঘরের দায়িত্ব নিতে হবে নিজেকেই
এডিস মশা মানুষের ঘরবাড়ির আশপাশেই ডিম পাড়ে। তাই নিজের বাসা, ছাদ, বারান্দা, টব, পানি জমে থাকা পাত্র ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও নাগরিকদেরই বলে মনে করেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, আমরা অনেক সময় সব দায় সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে দিই। কিন্তু ২০ বা ৩০ তলা ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে গিয়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের ঘরের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে।
ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, অনেকেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দোষারোপ করেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রধান দায়িত্ব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। মশা নিয়ন্ত্রণ করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ নয়।
তিনি বলেন, আমি সবসময় চাই রোগী যেন আমার কাছে না আসে। মানুষ সুস্থ থাকুক। রোগী এলে আমরা যেন সঠিক চিকিৎসা দিতে পারি- এটাই স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব। কিন্তু মশা মারার দায়িত্ব কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের নয়।
আরও পড়ুন
মশা দিয়েই মশা নিধন / বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে সিঙ্গাপুরের আজব কৌশল
গোলটেবিল আলোচনা সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক। আলোচনায় আরও অংশ নেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ।
অন্যদের মধ্যে উপস্থিতি ছিলেন জাগো নিউজের প্ল্যানিং এডিটর মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল, ডেপুটি এডিটর ড. হারুন রশীদ, প্রধান প্রতিবেদক ইব্রাহীম হুসাইন অভি, অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক আসিফ আজিজ প্রমুখ।
এএএইচ/এএসএ








