জনগণ যদি নিজেরাই জৈবিক লার্ভাসাইড ব্যবহার করেন, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন।
তিনি বলেন, নোভালুরন (Novaluron) ট্যাবলেট ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা সহজে ব্যবহারযোগ্য ও লার্ভা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ১২ দিনের প্রাক-বর্ষা লার্ভা জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ৩৬টি ওয়ার্ডকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ ও ১২টি ওয়ার্ডকে সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা / ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায় চাপানো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
চলতি বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি শাখার সহায়তায় এ জরিপ পরিচালনা করে বলে জানিয়েছেন ডা. নিশাত পারভিন।
জরিপের তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে বহুতল ভবনে (৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ)। এরপর রয়েছে স্বতন্ত্র বাড়ি (২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ) এবং নির্মাণাধীন ভবন (১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ)। তাই বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি ওয়ার্ড ও পরবর্তীসময়ে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ ৩৬টি ওয়ার্ডে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান বলে জানান তিনি।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা
এই কর্মকর্তা জানান, রাসায়নিক কীটনাশকের পাশাপাশি জৈবিক লার্ভাসাইড বিটিআই (BTI) ব্যবহারের প্রক্রিয়া চলছে। এটি মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর হলেও মানুষ, গবাদিপশু ও অধিকাংশ উপকারী প্রাণীর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ।
ডা. নিশাত পারভিন বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন শুরু করেছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিজ নিজ বাড়ি, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে কোথাও পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তার না ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, শুধু সিটি করপোরেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেই হবে না। সরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি বাড়ির মালিককে নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।
ডা. নিশাত পারভিন বলেন, সিটি করপোরেশনের দুটি স্লোগান—‘নিয়মিত প্রতিদিন জমা পানি ফেলে দিন’ এবং ‘বাড়ির আশপাশের আঙিনা পরিষ্কার করি, শহর পরিচ্ছন্ন রাখি, সবার স্বাস্থ্য ভালো রাখি’—বাস্তবে অনুসরণ করতে পারলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেক কমে আসবে।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু হলে যে ভুলগুলো করবেন না, চিকিৎসকের ৫ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন সমন্বিতভাবে বিভিন্ন নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে জানিয়ে বলেন, এসব কার্যক্রমের ফলে আগের বছরের তুলনায় ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। একই ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সারা দেশে বাস্তবায়ন করা গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এবং রোগীর সংখ্যা কমলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।
সভায় তিনি আরও জানান, এ বছর সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, সচিবালয়, স্কুল-কলেজ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারকে সম্পৃক্ত করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। লালবাগসহ বিভিন্ন জোনে প্রতিদিন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রায় ১২০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ৩০ থেকে ৪০ জন মশক নিয়ন্ত্রণকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাজ করছেন।
তিনি আরও বলেন, লার্ভাসাইড প্রয়োগের পাশাপাশি পানির মিটারগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যেখানে সম্ভব সেখানে বালি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং যেসব স্থানে তা সম্ভব নয়, সেখানে নতুনভাবে বিশেষ ট্যাবলেট ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এসব ট্যাবলেট প্রয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রায় তিন মাস পর্যন্ত লার্ভা জন্মাতে পারে না।
গোলটেবিল আলোচনার শুরুতে জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক আমন্ত্রিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জাগো নিউজে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন তুলে ধরেন।
আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ।
এছাড়া জাগো নিউজের প্ল্যানিং এডিটর মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল, ডেপুটি এডিটর ড. হারুন রশীদ, প্রধান প্রতিবেদক ইব্রাহীম হুসাইন অভি, অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক আসিফ আজিজসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এমডিএএ/এএসএ/ এমএফএ







