ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গত ২৬ বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা একের পর এক সুপারিশ দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়ায় বর্তমানে ডেঙ্গু রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু নাগরিকদের অসচেতনতাকে দায়ী করলে হবে না, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়হীনতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের অভাবই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বেশি দায়ী। এই সংকট দূর না হলে প্রতি বছর গোলটেবিল বৈঠক হবে, কিন্তু মানুষ ডেঙ্গুতে মৃত্যুবরণ করতেই থাকবে।
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতীক ইজাজ বলেন, ২০০০ সালের দিকে যখন দেশে ডেঙ্গু জাতীয়ভাবে পরিচিত হতে শুরু করে তখন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ হাসপাতালে বসে ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা ও রোগীর চিকিৎসা করতেন। এরপর গত ২৬ বছরে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অসংখ্য সুপারিশ ও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হতো তাহলে ২০২৬ সালে এসে ডেঙ্গু এত ভয়াবহ আকার ধারণ করত না এবং রাজধানীর বাইরে সারাদেশে এভাবে ছড়িয়ে পড়ত না।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ১০ অঞ্চলে একযোগে ডিএসসিসির ‘ক্লিনিং ডে’
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, নাগরিকরা নিয়মিত কর দিলেও তাদের সমস্যার কথা জানানোর মতো কার্যকর কোনো অভিভাবক খুঁজে পান না। আগে এলাকার কমিশনাররা নিজ নিজ এলাকার অলিগলি, বাড়িঘর ও স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সেই ঘনিষ্ঠতা না থাকায় কার্যকর সমন্বয়ের অভাব তৈরি হয়েছে। এই সমন্বয়হীনতাই ঢাকা থেকে দেশের অন্যান্য এলাকায় ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বা রোগতত্ত্ব বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বললেও সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করলে তারা আর পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে না। তাই সারাবছর ডেঙ্গু কর্নার চালু রাখা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান।
প্রতীক ইজাজ বলেন, এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র তিন-চার দিন চিকিৎসা নিলেই একজন রোগীর ৬০-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। মধ্যবিত্ত বা নিম্নআয়ের একটি পরিবারের জন্য এ ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কঠিন। তাই ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য শুধু নাগরিকদের অসচেতনতাকে দায়ী না করে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়বদ্ধতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর প্রস্তুতি বা দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। অথচ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জরিপে ব্রুটো ইনডেক্স ২০ থেকে ৪০-এর বেশি পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। প্রতি বছর জরিপ হলেও বাস্তবে মশার প্রজনন কমছে না।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষিত জনবলকে রাজনৈতিক কারণে ঘন ঘন বদলি করায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।
প্রতীক ইজাজ বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন স্থাপনা ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা যায়। পাশাপাশি নিয়মিত ও কার্যকর মনিটরিংয়েরও ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে প্রতি বছর একই আলোচনা চলবে, কিন্তু ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু রোগীর তথ্যে গরমিল, দিশাহারা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন
গোলটেবিল আলোচনার শুরুতে জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক আমন্ত্রিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জাগো নিউজে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন তুলে ধরেন।
আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক আয়েশা আক্তার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন।
এছাড়া জাগো নিউজের প্ল্যানিং এডিটর মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল, ডেপুটি এডিটর ড. হারুন রশীদ, প্রধান প্রতিবেদক ইব্রাহীম হুসাইন অভিসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এমডিএএ/এমআইএইচএস/এমএফএ








