সারা দেশে জুলাই ও আগামী (আগস্ট) মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সমস্যা মোকাবিলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন সম্ভব বলে আশা সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের।
গত কয়েক সপ্তাহে জেলায় প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হলেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ, প্রভাব এবং আক্রান্ত পরবর্তী করণীয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা এখনও সীমিত। তাই, এ রোগের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো সহায়ক বা Supportive চিকিৎসা। তবে, দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া অনেক সময় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয় বলে সতর্ক করেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মো. রফিক হায়দার।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গু ভাইরাস আসলে কী এবং এর উৎস কোথায়?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: ডেঙ্গু বর্তমানে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য মশাবাহিত ভাইরাসজনিত একটি সংক্রামক রোগ। এটি Flaviviridae পরিবারের Flavivirus গণভুক্ত একটি Positive-sense Single-Stranded RNA Virus। ভাইরাসটির জিনোমের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০.৭-১১ কিলোবেস।
ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়, ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎপত্তি এশিয়া ও আফ্রিকার বনাঞ্চলে প্রাণী এবং মশার মধ্যে বিদ্যমান একটি প্রাকৃতিক সংক্রমণচক্র থেকে। পরবর্তীকালে নগরায়ন ও Aedes aegypti মশার বিস্তারের মাধ্যমে এটি মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গু ভাইরাসের কয়টি সেরোটাইপ আছে? এগুলোর মধ্যে পার্থক্য কী?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: ডেঙ্গুর চারটি স্বীকৃত সেরোটাইপ রয়েছে- DENV-1, DENV-2, DENV-3, DENV-4। প্রতিটি সেরোটাইপ জিনগতভাবে আলাদা হলেও ক্লিনিক্যালভাবে একই ধরনের রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু অন্য সেরোটাইপে সংক্রমণের ক্ষেত্রে Antibody-Dependent Enhancement বা ADE-এর মাধ্যমে রোগের তীব্রতা বাড়তে পারে। এ কারণেই দ্বিতীয়বারের সংক্রমণ অনেক সময় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়।
জাগো নিউজ: মানুষ কীভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: সংক্রমিত স্ত্রী Aedes aegypti অথবা Aedes albopictus মশা মানুষের রক্ত পান করার সময় ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে। ভাইরাসটি প্রথমে ত্বকের ডেনড্রিটিক কোষে সংক্রমণ ঘটিয়ে বংশবিস্তার করে। এরপর লিম্ফ নোড, রক্তপ্রবাহ এবং বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গুর সাধারণ ও গুরুতর লক্ষণগুলো কী কী?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: সাধারণ লক্ষণগুলো হলো হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধির ব্যথা, বমি বমি ভাব, শরীরে লালচে র্যাশ এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা।
গুরুতর লক্ষণগুলো হলো তীব্র পেটব্যথা, অবিরাম বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং Dengue Shock Syndrome বা শক। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গুর জটিলতা কেন হয়? ভাইরাস নাকি শরীরের প্রতিক্রিয়া দায়ী?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: ডেঙ্গুর জটিলতা মূলত ভাইরাসের সরাসরি ক্ষতির কারণে নয়, বরং শরীরের অতিরিক্ত ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। ভাইরাস সংক্রমণের ফলে Cytokine Storm হয়। তখন TNF-α, IL-6, IL-8, IFN-γ (শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এক ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম বা সংকেত) বাড়ে। এর ফলে Endothelial Cell ক্ষতিগ্রস্ত হয়, Capillary Leakage শুরু হয়, Plasma Leakage-এর কারণে Hemoconcentration (রক্ত ঘন হয়ে যাওয়া) হয়, Platelet ধ্বংস বাড়ে এবং Coagulation System (রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া) ব্যাহত হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে Hypovolemic Shock ও Multi-organ Failure দেখা দিতে পারে।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গু নির্ণয়ের জন্য কোন পরীক্ষাগুলো করা হয়?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: ডেঙ্গু নির্ণয়ে NS1 Antigen Test, RT-PCR, IgM ELISA, IgG ELISA করা হয়। এছাড়া Complete Blood Count বা CBC, Liver Function Test, Serum Electrolytes এবং Hematocrit Monitoring এই রোগের অগ্রগতি বোঝার জন্য জরুরি।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা আছে কি?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: না, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা এখনও সীমিত। তাই, চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো সহায়ক বা Supportive চিকিৎসা। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, খাবার স্যালাইন গ্রহণ, প্রয়োজনে Intravenous Fluid Therapy (আইভি স্যালাইন চিকিৎসা) দিতে হয়। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়, তবে অ্যাসপিরিন ও NSAIDs (অন-স্টেরয়েডাল প্রদাহরোধী ওষুধ) একেবারেই পরিহার করতে হবে। প্ল্যাটিলেটে-এর সংখ্যা নয়, বরং Hematocrit (রক্তে লোহিত রক্তকণিকার শতকরা পরিমাণ) ও ক্লিনিক্যাল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের করণীয় কী?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: প্রতিরোধ ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় সমাধান। ব্যক্তিগত ও সামাজিক- দুদিক থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ফুলহাতা পোশাক পরা, মশারি ব্যবহার এবং মশা নিরোধক বা Repellent ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ (মশার বংশবৃদ্ধি রোধ এবং এদের ধ্বংস করার প্রক্রিয়া) কর্মসূচি চালাতে হবে।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন মৌসুমি রোগের সীমা অতিক্রম করে প্রায় সারাবছরই দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরন, উচ্চ তাপমাত্রা এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এডিস মশার বিস্তার বেড়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
জাগো নিউজ: ডেঙ্গু মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ করণীয় কী?
ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান: ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য কিন্তু সম্ভাব্য প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, যথাযথ তরল ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জটিলতা ও মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। গবেষণা, নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
এমআরএএইচ/এএমএ/এমএফএ








