দেশের স্বাস্থ্যখাতে সম্পদ ও জনবলের তীব্র সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিকিৎসক এবং নার্সরা আন্তরিকতার সঙ্গে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
রোববার (৫ জুলাই) নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে সম্মেলনটি হয়।
১১-১২ হাজার মানুষের বিপরীতে মাত্র একজন চিকিৎসক
স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশে চিকিৎসক সংকটের চিত্র তুলে ধরে জানান, গড়ে প্রতি ১১ থেকে ১২ হাজার মানুষের বিপরীতে মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন। একজন চিকিৎসকের পক্ষে এক কক্ষে থাকা ২০, ৩০ বা ৪০ জন রোগীর সঠিক যত্ন নেওয়া কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। তবুও চিকিৎসকরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এবং তারা মানুষের সেবায় নিবেদিত প্রাণ।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি সুস্থ জাতি ছাড়া কখনোই শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় উপাদান। অন্যথায় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দেশীয় উদ্ভাবন ও ৩০০ টাকার প্রযুক্তি
নিউমোনিয়া আক্রান্ত নবজাতকদের জীবন রক্ষায় দেশের চিকিৎসকদের উদ্ভাবিত একটি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রশংসা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মাত্র ৩০০ টাকা খরচের একটি বিশেষ বুদবুদ (বাবল-সিপিএপি) সিস্টেম ব্যবহার করে আমরা শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছি। এতে যে অক্সিজেন নবজাতকের ফুসফুসে প্রবেশ করে না, তা একটি বোতলে ফিরে এসে বুদবুদ তৈরি করে এবং পুনরায় সেখান থেকে ফুসফুসে অক্সিজেনের প্রবাহ নিশ্চিত করে। এটি ফুসফুসকে পরিষ্কার রাখে এবং পুনরায় অক্সিজেন গ্রহণের জায়গা তৈরি করে। এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনের জন্য সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবকের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।’
আমদানিনির্ভরতা কমানোর তাগিদ
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমাদের বিজ্ঞানীরা যে কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন, যেমনটি আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দেখিয়েছিলাম। তবে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পার হলেও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দুঃখজনক। কাঁচি থেকে শুরু করে প্যাথলজিক্যাল টেস্টের আধুনিক যন্ত্রপাতি- সবই আমাদের বিদেশ থেকে আনতে হয়, যা অর্থনীতির জন্য কাম্য নয়।’
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা হলো সঠিক উদ্যোগ ও ধারাবাহিক সহায়তার অভাব। গ্রামীণ পর্যায় থেকেও অনেক বিজ্ঞানী উঠে আসছেন, কিন্তু তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তবে বর্তমান বাজেটে নতুন নতুন উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে এ ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক।’

দেশীয় প্রযুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি
চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে প্রতিদিন দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, যদি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা স্থানীয়ভাবে এসব প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম তৈরি করতে পারেন, তবে সরকার স্থানীয় উৎপাদন নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘একদল বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি প্রকল্প উপস্থাপন করেছেন। তারা দুই ধরনের দেশীয় অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করতে যাচ্ছেন- একটি দুর্গম গ্রামীণ অঞ্চল থেকে রোগী আনার জন্য এবং অন্যটি দূরপাল্লার যাতায়াতের জন্য। আগামী চার বছরের মধ্যে এই প্রকল্পকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সরকার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করতে যাচ্ছে।’
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিশ্রুতি
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রতিটি গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে চিকিৎসকদের পাশাপাশি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা যদি দেশেই উন্নতমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম উদ্ভাবন করতে পারেন, তবে বিদেশি ডিলারদের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় বন্ধ হবে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।’
বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের যে কোনো ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হলে আমরা তা দিতে প্রস্তুত। আপনারা নিজেদের গুটিয়ে না রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে আসুন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি নিজে আপনাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করতে প্রস্তুত।’
সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সিদ্দিক-ই রাব্বানী ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
এসইউজে/একিউএফ








