দেশে প্রতিবছর বর্ষাকাল শুরু হলে ডেঙ্গু সংক্রমণ পরিস্থিতি প্রকট হতে শুরু করে। মশা ও এর আবাসস্থল ধ্বংসে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয়। ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় শুক্রবার সকাল আটটা থেকে শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত ঘণ্টায় ১৫৮ জন ডেঙ্গুরোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আট হাজারের (৭৯৭৩) ঘর ছুঁইছুঁই করছে। ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যুর তথ্য দেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রবণতা কম দেখা গেলেও জুন থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। ডেঙ্গুর সংক্রমণবিষয়ক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের শনিবার সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ৯৭৩ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে ৭১৪, জুনে ২ হাজার ৯০৭ এবং জুলাইয়ের ১০ দিনে ১ হাজার ৭১১ জন। অন্যদিকে মৃত্যুর তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে এক থেকে দুজনের মৃত্যু হলেও জুনে প্রাণ গেছে ১৩ জনের। আর জুলাইয়ের প্রথম ১০ দিনে মারা গেছেন ছয়জন। সব মিলিয়ে ২৪ জনের প্রাণ গেছে এখন পর্যন্ত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, মে মাস থেকে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ায় জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রোগী বাড়া স্বাভাবিক। চলতি বছর থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ায় বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন বেড়েছে, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভিসাইডিং এবং সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চলে সংরক্ষিত খাবার পানির পাত্রে এডিস মশার প্রজননের বিষয়টি উদ্বেগজনক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৫২, ময়মনসিংহ বিভাগে তিন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০, খুলনা বিভাগে ৩৪ এবং বরিশাল বিভাগে ৩৯ জন রয়েছেন। চলতি বছরের ১১ জুলাই সকাল পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ৯৭৩ জন। চলতি বছরে এ যাবত মোট সাত হাজার ২৯১ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ৬৫৮ জন চিকিৎসাধীন আছেন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) এন্টোমোলোজি (কীটতত্ত্ব) বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা মূলত এডিস মশার ঘনত্বের ওপর নির্ভরশীল, আর এডিসের বিস্তার নিয়ন্ত্রিত হয় বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতার মতো পরিবেশগত উপাদান দ্বারা। বর্ষা মৌসুমে এসব অনুকূল থাকায় এডিসের প্রজনন ও জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয়, ফলে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়ে। তিনি বলেন, প্রতিবছর অন্তত তিনবার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এডিস মশার ঘনত্ব জরিপ করা প্রয়োজন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ, ব্যবহৃত কীটনাশকের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসে সম্পৃক্ত করা জরুরি।