চিকিৎসক বাবার হাত ধরে বড় হওয়া। স্বপ্ন ছিল বাবার মতো মানুষের সেবা করার। আর সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দিতে বেছে নিয়েছিলেন দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি)। বলছি ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা ও ডা. ইশরাত জাহান ইভা—দুই বোনের কথা। আজ তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রেখে দেশের চিকিৎসাসেবায় রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
শনিবার (১১ জুলাই) ৮১তম ডিএমসি ডে উপলক্ষে তারা ফিরে গিয়েছিলেন সেই চিরচেনা ক্যাম্পাসে। ব্যস্ততার মধ্যেও পুরোনো স্মৃতির পাতা উল্টে দেখলেন সোনালি দিনগুলো। শুধু তারাই নন, ক্যাম্পাসের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তাদের উপস্থিতিতে ডিএমসি প্রাঙ্গণ যেন ফিরে পেয়েছিল তারুণ্যের সেই উচ্ছ্বাস।
এদিন স্বামী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে এসেছেন একই কলেজের ছাত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। তাদের সেলফি নীলা-ইভাসহ সবাইকে উজ্জ্বীবিত করেছে। কী প্রধানমন্ত্রী পত্নী, কী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছোটবড় সবাই হারিয়ে গেছেন তরুণ্যের সেই উচ্ছ্বাসে।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্যমন্ত্রী / চিকিৎসকের হাসিমুখে কথা বলা রোগীকে অর্ধেক সুস্থ করে দিতে পারে
ডা. নীলা ও ডা. ইভা জাগোনিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ডিএমসির শিক্ষার্থী। এই দিনে তারাও এখানে এসেছেন। ডিএমসিয়ানদের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন, এটি দিবসের আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে। আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।
স্বপ্নের শুরু যেখান থেকে
চিকিৎসক পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবার ব্রত তাদের মনে গেঁথে গিয়েছিল। বড় বোন ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা ২০০২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তার দেখানো পথ ধরেই ছোট বোন ডা. ইশরাত জাহান ইভা পরবর্তী সময়ে একই ক্যাম্পাসের যাত্রী হন।
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন/ছবি: জাগো নিউজ
নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ডা. নীলা জাগো নিউজকে বলেন, আমি বিশ্বাস করি অন্যের জন্য ভালো কিছু করলে আল্লাহ তার প্রতিদান দেন। ডিএমসি আমাকে শুধু চিকিৎসক বানায়নি, তৈরি করেছে একজন সেবাপরায়ণ মানুষ হিসেবে। রোগীর সেবায় নিজেদের রক্ত দেওয়া কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে তহবিল গঠন করে গরিব রোগীদের সহায়তায় এগিয়ে আসার মানবিক শিক্ষাটা আমরা এই ক্যাম্পাস থেকেই পেয়েছি।
আরও পড়ুন
সার্বক্ষণিক নির্ভরতার জায়গা হলো ঢাকা মেডিকেল: প্রধানমন্ত্রী
অন্যদিকে, সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. ইশরাত জাহান ইভা তার স্মৃতির ঝাঁপি খুলে জাগো নিউজকে বলেন, ছোটবেলায় ‘এইম ইন লাইফ’ রচনায় চিকিৎসক হওয়ার কথা লিখতাম গৎবাঁধাভাবে। কিন্তু ২০০৫ সালে আপুর ক্যাম্পাসে আসার পর কিশোরী মনে প্রবল আকাঙ্ক্ষা জন্মায়, আমিও যেন এই ক্যাম্পাসের ছাত্রী হতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সেই সুযোগ দিয়েছেন।
ক্যাম্পাসের শিক্ষা ও জীবনের অঙ্গীকার
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রতিটি কোণ যেন একেকটি পাঠশালা। ডা. ইভার মতে, ডিএমসিকে বলা হয় ‘রোগীর স্বর্গরাজ্য’, যেখানে প্রতি পদক্ষেপে নতুন নতুন কেস শেখার সুযোগ থাকে। ইন্টার্নশিপ থেকে শুরু করে বিসিএস এবং পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনের কঠিন লড়াই—সবখানেই ডিএমসির শিক্ষা ছিল তাদের চালিকাশক্তি।
শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবাই নয়, দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেও পিছিয়ে থাকেননি তারা। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে ঢামেকের শিক্ষার্থীরা থেকেছেন সামনের সারিতে। দুই বোনই নিজেদের রাজনৈতিক সচেতন ও দেশপ্রেমিক ডিএমসিয়ান হিসেবে গর্ববোধ করেন।
বর্তমান পরিচয় ও আগামীর স্বপ্ন
বর্তমানে ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক ও ভিট্রিও-রেটিনা বিভাগের ইউনিট হেড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, ডা. ইশরাত জাহান ইভা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার (সার্জারি) হিসেবে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
ডা. ইশরাত জাহান ইভা বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার (সার্জারি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন/ছবি: জাগো নিউজ
নিজের কর্মক্ষেত্রে সফল হলেও স্বপ্নের ক্যাম্পাসের প্রতি টান কমেনি তাদের। ডা. ইভা বলেন, যেখানেই থাকি না কেন, ডিএমসিকে মনেপ্রাণে ধারণ করি। আশা রাখি, একদিন আবার ফিরে আসব ডিএমসিতে; তবে ছাত্র হিসেবে নয়, শিক্ষক হয়ে।
শত ব্যস্ততার মধ্যেও দুই বোনের এই সফলতার গল্প নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন
ঢাকা মেডিকেলে পড়ার ও ইন্টার্নশিপের নানা স্মৃতি তুলে ধরলেন ডা. জুবাইদা
এই চিকিৎসক দুই বোনের একমাত্র ভাই ডা. আহমদ মাসুদ রিফাত আর্ম ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগের রেসিডেন্ট। তাদের বাবা ডা. মো. আব্দুল খালেক তালুকদার ময়মনসিংহ মেডিকেল থেকে পাস করেন এবং একই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ২০১৫ সালে অবসরে যান।
১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ আমলে যাত্রা শুরু করে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মেডিকেল কলেজ। এবার ৮০ বছর পূর্ণ করে পদার্পণ করছে ৮১তম বছরে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হলেও একদিন পর অর্থাৎ ১১ জুলাই সাড়ম্বরে ‘ডিএমসি ডে’ উদযাপন করা হয়। এদিন কলেজটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে নিয়ে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আরও পড়ুন
ঢামেককে বিশ্বমানের করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৪ দফা স্মারকলিপি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে রাজধানীর মানুষের ‘সার্বক্ষণিক নির্ভরতার জায়গা’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষ ও করিডোরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আনন্দ-বেদনার গল্প রচিত হয়। এখানে যেমন অনেক জীবনের অবসান ঘটে, তেমনি অসংখ্য নতুন জীবনেরও সূচনা হয়। স্টেথোস্কোপের এক প্রান্তে একজন চিকিৎসকের কান থাকে, অন্য প্রান্তে স্পন্দিত হয় একটি মানুষের জীবন। চিকিৎসক ও রোগীকে ঘিরে আবর্তিত হয় একটি পরিবারের অগাধ বিশ্বাস।
এসইউজে/এমএমকে








